Magic Lanthon

               

কৃষ্ণ কুমার

প্রকাশিত ০৩ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘সহিংসতার প্রকাশকে আমি নেতিবাচক না ভেবে শারীরিক ভাষা বলতেই বেশি পছন্দ করি’

কৃষ্ণ কুমার


পৃথিবীতে যে-কয়েকটি দেশের চলচ্চিত্রে হলিউডের ওপর নির্ভরতা নেই, তাদের মধ্যে অন্যতম দক্ষিণ কোরিয়া। ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক সামাজিক ইস্যু ও অপ্রত্যাশিত নানা ঘটনা দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমাকে হলিউডি সিনেমা থেকে পৃথক করেছে। আজকের এই পথচলা শুরু হয়েছিলো ১৯০৩ সালে। ১৯৪৪ সালে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় কোরিয়া। স্বাভাবিকভাবেই স্বাধীন হয় কোরিয়ান চলচ্চিত্র। কিন্তু এই নবজাগরণ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অল্পদিনের মধ্যেই বিভক্ত হয় কোরিয়া। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ১৯৫৩ সালে যুদ্ধ শেষ হলে পুনরুজ্জীবন ঘটে দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমার। কিন্তু ১৯৬২ তে এসে এ-শিল্পে সরকারি খবরদারি বাড়তে থাকে। ফলে শিল্পে নেমে আসে হতাশা। তারপরও ৫০ ও ৬০’র দশককেই কোরিয়ান সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা হয়। কিন্তু এ-সময়ের সিনেমাগুলোর গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। যাহোক সর্বশেষ ২০০৫ সালের দিকে আবারও পুনর্জন্ম ঘটে দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পের। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থানে আসতে পেরেছে দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র।

কোরিয়ান চলচ্চিত্র শিল্পে এই যে পুনর্জাগরণ তা যে-কয়েকজন কারিগরের হাত দিয়ে ঘটেছে তাদের অন্যতম কিম কি দুক। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার এই যুগে সংলাপবিহীন চলচ্চিত্র যখন প্রায় অচ্ছুত, সেই সংলাপবিহীন বা স্বল্প সংলাপের চিত্রনাট্যও মাস্টারপিস চলচ্চিত্রে পরিণত হয় যার হাতের ছোঁয়ায়-তিনিই এই কিম কি দুক। বর্তমান চলচ্চিত্র বিশ্বের একজন অসাধারণ প্রতিভা। বয়সে নবীন কিম কি দুক-এর জন্ম ২০ ডিসেম্বর ১৯৬০, দক্ষিণ কোরিয়ার কিওংসাং প্রদেশে।

চলচ্চিত্রে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই তার। স্কুলের গণ্ডি না পেরোতেই ছেড়ে দেন পড়াশুনা। কাজ নেন কারখানায়। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। শিল্পে যার মন তিনি কী আর  সৈনিকের নিয়ম-কানুন মেনে নিতে পারেন! তাই এবার চলে গেলেন শিল্প-সাহিত্যের আঁতুড়ঘর প্যারিসে। এবার  সেখানে (১৯৯০-১৯৯৩) পড়াশুনা করলেন ফাইন আর্টস বিষয়ে। এরপর ফিরে এলেন নিজ দেশে; শুরু করলেন স্ক্রিপ্ট লেখা। প্রথম স্ক্রিপ্টেই নজর কাড়লেন; জিতে নিলেন প্যারিজমস স্ক্রিপ্ট রাইটিং ইন্সটিটিউট পুরস্কার। তারপর শুধুই এগিয়ে চলা। ক্রোকোডাইল (১৯৯৬) দিয়ে শুরু করে ২০১১ পর্যন্ত ১৭টি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। এরমধ্যে ব্রিডকেজ ইন (১৯৯৮), রিয়েল ফিকশন (২০০০), দ্য ইসল (২০০০), এড্রেস আননোন (২০০১), ব্যাডগাই (২০০১), স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার এন্ড স্প্রিং (২০০৩), থ্রি-আয়রন (২০০৩), ব্রেথ (২০০৭), ড্রিম (২০০৮) ও আমেন (২০১১) উল্লেখযোগ্য। বেশিরভাগ ছবিই বিশ্বজুড়ে হয়েছে আলোচিত-সমালোচিত।

কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ কিম বিভিন্ন উৎসবে গোটা পঁচিশেক মনোনয়নসহ ঝুলিতে ভরেছেন নয়টি পুরস্কার। এগুলোর বেশিরভাগই কান, ভেনিস ও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বিশ্বখ্যাত উৎসবের। ২০০১ সালে ব্যাডগাই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা করে। সেখানেই কিম কি দুকের সঙ্গে নতুন সিনেমা, হলিউড ও চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন ভোলকার হামেল (Volker Hummel)| পেশায় ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ভোলকার হামেল জার্মানির হামবুর্গে বসবাস করেন। এর বাইরে তার আগ্রহের জায়গায় রয়েছে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র। এ নিয়ে লেখালেখিও করেন। কিমের সঙ্গে সেদিনের আলোচনার পুরোটা ম্যাজিক লণ্ঠন-এর জন্য ভাষান্তর করেছেন কৃষ্ণ কুমার।

 

ভোলকার হামেল : মি. কিম, আপনি এক আলোচনায় বলেছিলেন আপনার প্রতিটি চলচ্চিত্রই নাকি শুরু হয় ঘৃণা বা ক্রোধ দিয়ে। আপনার নতুন চলচ্চিত্র ব্যাডগাইতে কোন্‌ ধরনের ঘৃণা বা ক্রোধ ফুটে উঠেছে?

কিম কি দুক : দেখুন, আমি ঘৃণা শব্দটিকে বৃহৎ অর্থে ব্যবহার করেছি। আমি ভাবতেই পারিনি এটাকে নেতিবাচকভাবে নেওয়া হবে। নির্দিষ্ট কোনোকিছুকে আমি ঘৃণা করি, সে-জন্য এটা ব্যবহার করেছি-এমন নয়। এটা এক ধরনের ভাবনা। জীবনে চলার পথে এমন অনেক বিষয় আছে যা আমরা বুঝি না। যে-বিষয়টিকে আমি বুঝি না, সেই বিষয়টি বোঝার জন্যই চলচ্চিত্র বানাই। আমাদের এই ‘মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং’ কথাটির পরিবর্তে আমি হ্যাট্রেড (hatred) কথাটি ব্যবহার করতে চেয়েছি।

হামেল : ব্যাডগাই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আপনি কোন্‌ বিষয়টা খুঁজতে চেয়েছেন?

দুক : আমি খুঁজতে চেয়েছি, আমরা সবাই একইভাবে সমান অধিকার ও গুণাবলী নিয়ে জন্মাবার পরও কেনো বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণীবিভক্ত হয়ে পড়ি? কেনো আমরা বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে সবকিছু বিচার করি? কেনো এটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে-আমি সুন্দর নাকি কুৎসিত, ধনী নাকি গরীব? জন্মের পর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ওপর এই বিষয়গুলো চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমরা সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণীর ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ি। যা সবাইকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমি দেখাতে চেয়েছি শ্রেণী-বৈষম্য ভুলে সবাই এক হয়ে বাস করা কি সত্যিই অসম্ভব?

হামেল : আপনি কি এ-প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন?

এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা গভীর দুঃখ পাওয়ার ফলে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। মানুষকে ধ্বংস করার বিষয়টিই তখন তাদের বিশ্বাস জুড়ে থাকে। পাশে থাকা অনেক মানুষ, যারা তাদেরকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা রাখে না; মুখে বলে এক আর করে আরেক। ফলে তাদের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কথা বলা। এ-সময় মানুষ জড়িয়ে পড়ে সহিংসতায়। তাদের এই সহিংসতার প্রকাশকে আমি নেতিবাচক না ভেবে, শারীরিক ভাষা বলতেই বেশি পছন্দ করি।

দুক : প্রতিটি মানুষ শ্রেণী-বিভেদ ভুলে, অর্থনৈতিক বৈষম্য ভুলে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে-এটাই আমার প্রশ্নের উত্তর। কিন্তু আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্য তা নয়। মানুষকে এসব প্রশ্নের সম্মুখীন করাই আমার চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম লক্ষ্য। আমার বিশ্বাস প্রত্যেকেই তার নিজের মতো করে এ-প্রশ্নের উত্তর পেতে পারেন।

হামেল : আপনার প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রের মুখে বেশি সংলাপ থাকে না। সংলাপের মাধ্যমে তারা যোগাযোগ কিংবা নিজেকে প্রকাশ করতে পারে না। সহিংসতাই হয়ে ওঠে তাদের অন্যতম ভাষা। এই নীরবতার কারণ কী?

দুক : এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা গভীর দুঃখ পাওয়ার ফলে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে। মানুষকে ধ্বংস করার বিষয়টিই তখন তাদের বিশ্বাস জুড়ে থাকে। পাশে থাকা অনেক মানুষ, যারা তাদেরকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা রাখে না; মুখে বলে এক আর করে আরেক। ফলে তাদের ওপর বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কথা বলা। এ-সময় মানুষ জড়িয়ে পড়ে সহিংসতায়। তাদের এই সহিংসতার প্রকাশকে আমি নেতিবাচক না ভেবে, শারীরিক ভাষা বলতেই বেশি পছন্দ করি।

আমার কাহিনীর চরিত্রগুলো যুবক বয়স থেকেই দুঃখ-দুর্দশার এমনসব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যে, তখন সে তার নিজের চিন্তা-ভাবনার বাইরে কিছুই ভাবতে পারে না। এমনকি সাড়াও দিতে পারে না। একই সঙ্গে তারা তাদের শরীরের অপব্যবহারকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আমি একটি উদাহরণ দিতে পারি, কিছু কিছু পরিবার রয়েছে যেখানে শিশুরা জন্মের পর থেকেই তাদের বাবা-মার মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ এমনকি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া দেখতে থাকে। রাস্তায় বের হয়ে অনেক সময় এরা মানুষের খারাপ আচরণের সম্মুখীন হয়। তখন তার মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা জন্মে, সে ভাবতে থাকে সবাই তাকে অবজ্ঞা করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমারও এ-ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ছোটবেলায় আমার চেয়ে যারা বয়সে ছোট কিন্তু শারীরিকভাবে শক্তিশালী তারা আমাকে বিনা কারণে মারতো। আমাকে নীরবে সহ্য করতে হতো। এমনকি আমি যখন নৌ-সেনা হিসেবে চাকরি করি তখনও আমার চেয়ে যারা উঁচু পদের ছিলো তারা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আমাকে আঘাত করতো। এসব অভিজ্ঞতায় আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, কেনো এমনটি হবে? পরিচালক হওয়ার আগ পর্যন্ত এই চিন্তা-ভাবনাগুলো আমার মাথায় ঘুরপাক খেতো। এখন আমি এই চিন্তা-ভাবনাগুলোর প্রতিফলন আমার চলচ্চিত্রে তুলে ধরি।

হামেল : তার মানে আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাই তাহলে চলচ্চিত্রে তুলে এনেছেন?

দুক : ব্যাডগাই-এ আমি প্রথমেই যে-কথাটি বলতে চেয়েছি, এর প্রধান চরিত্র হ্যাং-গাই টাইপের মানুষকে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু একটি মানুষ কেনো অন্য কারও কাছে অপছন্দের হয়ে ওঠে? সে যখন একটা বড়ো শহরে কাজ করতে যায়, তখন কোনো কারণ ছাড়াই অন্যরা তাকে আঘাত করে। এর ফলে সে তাদের ঘৃণা করতে থাকে। একটা পর্যায়ে সে আগ্রাসী হয়ে ওঠে। আমি আমার সিনেমায় এটাই দেখাতে চেয়েছি-একজন মানুষ কেনো আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

হামেল : শোনা যাচ্ছে, হলিউড নাকি আপনার ব্যাডগাই সিনেমা রিমেক করবে এবং পরিচালক হিসেবে নাকি আপনিই থাকছেন?

দুক : ব্যাডগাই হলিউডে নির্মাণ করা আমারও ব্যক্তিগত ইচ্ছা। সেখানে ব্র্যাড পিটকে নেওয়ার ইচ্ছা আছে। তবে এ-ব্যাপারে এখনও হলিউডের কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

হামেল : আপনি কী মনে করেন না যে, আপনার নিতান্তই একান্ত ভাবনা এবং সহিংসতার নন্দনতত্ত্ব হলিউডি ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে?

দুক : বাইরে থেকে মনে হতে পারে হলিউডে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছু শক্ত নীতিমালা মেনে চলা হয়। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আমি সেটি মনে করি না। তারা যা প্রকাশ করতে চায় তাই করে। কিন্তু সেটি সরাসরি নয়। তাই এটি মনে হতে পারে যে, তারা একটা সীমার মধ্যে থাকে। আসলে তা নয়। তাই যদি সম্ভব হয় আমি তাদের ধারা অনুসরণ করে সেখানে কাজ করতে চাই। পাশাপাশি ব্যাডগাই সিনেমাটি ফরাসি ভাষাতেও নির্মাণ করার ইচ্ছা আছে। তবে হলিউডে নির্মাণের কথাটা আপনার জানার বিষয়টি আমার কাছে আশ্চর্যের। কারণ এটি আমি আমার বিপণন দলের সদস্যদের মজা করে বলেছিলাম। তা বাইরের কারও শোনার কথা নয়।

হামেল : ২০০১ সালের পুশন চলচ্চিত্র উৎসবের একটা প্রবন্ধে আমি এটি পড়েছিলাম।

দুক : আমার মনে হয় এটি আমার পরিবেশকের কাছ থেকে বেরিয়েছে। ওভারসিজ ডিপার্টমেন্ট আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলো এটি সম্ভব কি না, আমি এটি করতে পারি কি না? উত্তরে আমি হ্যাঁ বলেছিলাম।

হামেল : অনেকের মতে, ডেভিড ফিশারের ফাইট ক্লাব (১৯৯৯) এর কাহিনীর সঙ্গে নাকি আপনার ব্যাডগাই এর কাহিনীর মিল আছে। আপনি কি দুইটার মধ্যে কোনো সাদৃশ্য দেখতে পান?

দুক : হতাশার কথা হলো, আমি ফাইট ক্লাব দেখিনি। তবে মনে হয়, এটা আমার রিয়েল ফিকশন চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলতে পারে। যেটি মাত্র তিন ঘণ্টা ২০ মিনিটের শটে নির্মিত। এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি যাদেরকে ঘৃণা করে তাদের খুন করে। কিন্তু শেষে দেখা যায়, খুন করা তার স্বপ্ন বা নেশা। কিছুটা ম্যারি হ্যারন-এর আমেরিকান সাইকো (২০০০) এর মতো।

হামেল : আপনার ওয়েবসাইটে (www.kimkiduk.com) আপনি আপনার চলচ্চিত্রকে আংশিক বিমূর্ত (semi abstract) বলেছেন। এটি বলতে আপনি কী বুঝিয়েছেন?

দুক : আমার ধারণা semi abstract সিনেমা হলো বাস্তবতাকে তুলে ধরা। আমরা এই বিশ্বে যা কিছু দেখি, এটা সম্বন্ধে যে চিন্তা-ভাবনা গড়ে ওঠে তা তুলে ধরার চেষ্টা করা।

হামেল : সিনেমা জগতে পদার্পণের আগে আপনি একজন পেইন্টার ছিলেন। ২০০০ সালে নির্মিত আপনার সিনেমা দ্য ইস্‌ল (The Isle) এ আপনি সুরিয়ালিজম ধারা এবং কিছুটা বর্ণনাধর্মী ধারা ব্যবহার করেছেন। ব্যাডগাই সিনেমায় ইগন শিলি (Egon Schile)-এর একটি পেইন্টিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দুক : ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ারে আমি দুই বছর পেইন্টার হিসেবে কাজ করেছি। তবে কোনো অফিসিয়াল প্রদর্শনী বা এ-রকম কিছু করিনি। নিজের মতো এঁকেছি এবং রাস্তায় রাস্তায় এর প্রদর্শনী করেছি। জার্মানির মিউনিখেও কিছু পথ-প্রদর্শনী করেছি। কাজের সূত্রে ইগন শিলি-এর সঙ্গে আমার পরিচয়। তার পেইন্টিং আমার ভালো লাগতো। তার কিছু কুরুচিপূর্ণ এবং অশ্লীল ছবি আমার ব্যাডগাই সিনেমায় জুড়ে দিই। আপাত দৃষ্টিতে অশ্লীল মনে হলেও তা কিন্তু সৎ উদ্দেশ্যে নির্মিত। তিনি পেইন্টিংয়ে হতাশাগ্রস্ত মানুষের ইমেজ তুলে ধরেন। আমি গুস্তাভো ক্লিম্‌ত (Gustavo klimt) এর কাজ বেশি পছন্দ করলেও ইগন শিলি-এর কাজ বেশি দেখার ফলে তার শিল্পকর্মই ব্যবহার করেছি।

হামেল : ইগন শিলি সাধারণত বেশ্যা বা পতিতা এবং পরিত্যক্তা নারীদের নিয়ে ছবি আঁকতেন। যা আপনার দ্য ইস্‌ল, অ্যাড্রেস আননোন, ব্যাডগাই-এর কাহিনীর সঙ্গে মিলে যায়। যে নারী বাধ্য হয়ে দেহব্যবসা করে তার সম্বন্ধে আপনার ধারণা কেমন, এ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

দুক : আমি মনে করি মানুষ হিসেবে নারীদের অবস্থান পুরুষের চেয়ে অনেক উপরে। তারা সবসময়ই পুরুষের সব ধরনের চাহিদা মেটায়। কিন্তু প্রতিদানে বেশিরভাগ সময়ই কিছুই পায় না। বেশিরভাগ মানুষই দ্বিমত পোষণ করবেন, তারপরও আমি আমার মতো করে বলতে চাই; নারী ও পুরুষের মধ্যে যে-সম্পর্ক তা সম্পূর্ণ বেশ্যাবৃত্তির মতো। এমনকি টাকা-পয়সার ব্যাপার না থাকলেও ব্যাপারটি এরকমই। যা নারী-পুরুষের মধ্যে একটি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। ভিন্ন-ভিন্ন সংস্কৃতিতে এই দ্বন্দ্বটা ভিন্ন রকমের। ইউরোপিয় চলচ্চিত্রগুলোতে দেখা যায়, নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের স্ট্যাটাসকো তুলে ধরে। এশিয়ান চলচ্চিত্রগুলোতে ধর্ষণ এবং সহিংসতার বিষয়টা বেশি দেখানো হয়। কারণ এখানে নারী-পুরুষের যে দ্বন্দ্ব তার পরিমাণটা বেশি।

হামেল : আপনার আগের চলচ্চিত্রগুলোর মতো ব্যাডগাই সম্পর্কেও কি নারীবাদীদের ক্ষোভ আছে?

দুক : অবশ্যই। নব্বইভাগ নারীবাদীর চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। কিন্তু আপনি যদি দর্শকদের কথা ভাবেন, তাহলে দেখবেন তাদের শতকরা আশি ভাগই নারী। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই নেতিবাচকভাবে সিনেমা দেখে। কিন্তু সাধারণ দর্শকেরা সেটা খুব সহজেই গ্রহণ করে। তারা সেটি বোঝার চেষ্টা করে। আমার চলচ্চিত্র দেখে কেউ যদি মনে করে যে, কিম কি দুক তার চলচ্চিত্রে নারীদের হতাশার চিত্র তুলে ধরেছেন-তাহলে সেটি হবে মারাত্মক ভুল। কিন্তু আপনি যদি মনে করেন এটি সমাজে বিরাজমান সমস্যার চিত্রাঙ্কন তাহলে ব্যাডগাই চলচ্চিত্রটিকে ঘৃণা করবেন না।

হামেল : কোরিয়াতে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাডগাই অন্যতম ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র। আপনি কি মনে করেন অর্থনৈতিক সফলতা মানে শৈল্পিকভাবে ব্যর্থতা?

দুক : চলচ্চিত্রের শৈল্পিক উপস্থাপনা অনেক সময় ব্যবসাসফল নাও হতে পারে। কিন্তু আমার ব্যাডগাই সিনেমাটি ব্যবসা করার অন্যতম কারণ সিনেমার অভিনেতা চো জে-হুয়ান। তিনি ছিলেন মূলত একজন টিভি অভিনেতা। এরপর হঠাৎ করেই জনপ্রিয় অভিনেতা হয়ে ওঠেন। আর তাই আমি মনে করি তার জন্যই সিনেমাটা শৈল্পিক হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসাসফল হয়েছে।

কিম কি দুক-এর আরেকটি সাক্ষাৎকার

আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোর ওয়ারউইক রেজিস হোটেলে ২০০৫ সালের এপ্রিলে এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন গ্রাউচো (Groucho)। গ্রাউচো এই আলোচনায় দুক-এর ২০০৩ সালে নির্মিত থ্রি-আয়রন (3-Iron) সিনেমাটি নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি সামান্য সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো।   

 

গ্রাউচো : আপনি বলেছেন যে, আপনার চলচ্চিত্র নাকি আপনাকেই অনুসন্ধান করে। থ্রি-আয়রন  চলচ্চিত্রটি আপনাকে বুঝতে কতোটা সাহায্য করবে কিংবা আপনার সম্পর্কে কী শিক্ষা দেবে?

দুক : অনেক ধরনের চলচ্চিত্র হতে পারে। অনেক চলচ্চিত্রে মানুষকে খারাপভাবে তুলে ধরা হয় এবং সেসব মানুষকে সমাজ থেকে উচ্ছেদ করার কথা বলা হয়। অন্যদিকে ভালোবাসাকেন্দ্রিক ও মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ চলচ্চিত্রও নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আমার সিনেমার কাহিনীতে থাকে জীবনের কথা, থাকে মানব প্রজাতির কথা এবং এগুলো কী অর্থ তৈরি করে তার কথা। স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার এন্ড স্প্রিংথ্রি-আয়রন (২০০৩) চলচ্চিত্রে আমি এগুলোই খোঁজার চেষ্টা করেছি।

আমি বুঝতে চেয়েছি পৃথিবীটা দখল করে আমরা কীভাবে বাস করছি; এটা কতোটা ন্যায়সঙ্গত? আমরা আসলে কী করছি-আমি সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। তাই সিনেমায় আমি এমনসব বিষয় তুলে ধরি যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির দর্শক ভাবতে পারে।

গ্রাউচো : নির্মাতা হিসেবে আপনি সবসময়ই চেষ্টা করেন চলচ্চিত্রে নতুন ধারণা তুলে ধরতে। আপনি কী আমাদের একটু বলবেন এসব নতুন চিন্তার উৎস কোথায়?

দুক : চলচ্চিত্রের জন্য যে-পূর্বচিন্তা তা হতে হবে সহজ-সরল। প্রথমে আমি একটা সমস্যা চিহ্নিত করি। তারপর সেটার জট খোলার চেষ্টা করি। একটা চোর একটা ফাঁকা বাড়ি পেয়ে যেমন চুরি করে, তেমনি আমিও সেই সুযোগে থাকি। কখন এরকম একটা সুযোগ আসবে। এরকম একটা সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি তা নিয়ে প্রাথমিক পরিকল্পনা শুরু করি। আমি সবসময় সমাজের ব্যতিক্রম কিছু খোঁজার চেষ্টা করি। অলৌকিক বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করি। মানুষের লক্ষ্য, পরিপ্রেক্ষিত খোঁজার চেষ্টা করি।

গ্রাউচো : আপনার প্রতিটি সিনেমাতেই সংলাপ কম থাকে, কেনো?

দুক : কোনো কাহিনী যখন বর্ণনাত্মকভাবে লিখি তখন কিন্তু সেখানে সংলাপ থাকে। কিন্তু প্রাথমিক নির্মাণের সময় আমি একেবারেই তা বাদ দিয়ে দিই। আবার চূড়ান্তভাবে নির্মাণের সময় প্রয়োনজনবোধে কিছু সংলাপ রাখি। তবে আমি মনে করি না, সংলাপই একটা ভালো চলচ্চিত্রের মূল উপাদান। হাসি-কান্নাও অন্যতম সংলাপ হতে পারে।

গ্রাউচো : চলচ্চিত্র তৈরিতে আপনার কাছে অভিনেতাদের গুরুত্ব কেমন?

দুক : চলচ্চিত্রে অভিনয়ে বেশি দক্ষ নয়-এমন অভিনেতাদেরই আমি নিতে বেশি পছন্দ করি। একেবারেই নতুন যারা তাদেরও আমার চলচ্চিত্রে নিয়েছি। আমি মনে করি এসব অভিনেতা কাহিনীচিত্রে, প্রামাণ্যচিত্রের ভাবনা জুড়ে দেয় খানিকটা বাস্তবের মতো করে। তবে আমি এটা সবসময় নয়, মাঝেমধ্যে করি।

গ্রাউচো : প্যারিসে এমন কী হয়েছিলো যে আপনি চিত্রশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র ছেড়ে চলে এলেন। কিসের অনুপ্রেরণায় আপনি চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করলেন?

দুক : দেখুন, আমি সবসময়ই গল্প বলা এবং দক্ষতানির্ভর পেশা উপভোগ করি। আমি কখনও কলেজে যাইনি; ভাবতেই পারিনি কলেজে না পড়েও কেউ চলচ্চিত্রনির্মাতা হতে পারে। আমি যখন প্যারিসে ছিলাম, দেখলাম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ ছাড়াই অনেকেই এটা করছে। এ-বিষয়টাই আমাকে অনুপ্রাণিত করে। তাই আমি যখন কোরিয়াতে ফিরে এলাম তখনই চিত্রনাট্য লেখা শুরু করলাম। ভাবলাম আমি পারবো।

গ্রাউচো : আপনি কি গল্‌ফ খেলেন?

দুক : খেলি টুকটাক।

গ্রাউচো : সেটি কি রাগ কমাতে নাকি অন্য কোনো কারণে?

দুক : (স্মিত হেসে) আপনি কতোটা ভালো খেলেন সেটা কোনো ব্যাপার না। তবে এটা আমাকে একইসঙ্গে ক্রোধান্বিত আবার অনেক সময় বড়ো ধরনের চাপ থেকে মুক্তি দেয়। আপনি কিন্তু কখনই জানেন না কীভাবে বলটা মারতে যাচ্ছেন; একটা বল মারার পর আরেকটা অন্যরকম হবেই। বেশিরভাগ মানুষই মনে করে এটা ধনী লোকের খেলা। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এতে অল্প পরিমাণ হলেও ধ্যানগত এবং দার্শনিক ব্যাপার আছে। খেলায় উন্নতি করতে চাইলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না। গল্‌ফ খেলার সময় অবশ্যই আপনার মনকে শান্ত রাখতে হবে।

গ্রাউচো : আপনি এমন একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা যিনি স্বল্প বাজেটেই ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন। ভবিষ্যতে কি নিজের বাজেটকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

দুক : আপনি যেমন জানেন না তেমনি আমিও বলতে পারি না ভবিষ্যতে কী হবে। এটি হবে, কী হবে না-সময়ই বলে দেবে। কিন্তু আমি সবসময়ই স্বল্প বাজেটের মধ্যেই ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র বানাতে চাই।

গ্রাউচো: ব্যক্তিগতভাবে কোন্‌ চলচ্চিত্র থেকে আপনি বেশি সাড়া পেয়েছেন?  

দুক : শুধু থ্রি-আয়রন নয়, স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার...এন্ড স্প্রিং সিনেমাটিও আমি আমেরিকার লিংকন সেন্টারে দেখিয়েছিলাম। সেটি খুব বেশিদিন আগে নয়। সিনেমা শেষ হওয়ার পর আশির্ধ্বো এক শ্বেতাঙ্গ নারী হলে বসেই ছিলেন। তিনি আমার ইউনিটের লোকদের কাছে অনুরোধ করছিলেন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎতের ব্যবস্থা করার। সিনেমা দেখে তার নাকি ইচ্ছে হয়েছে, আমার হাত স্পর্শ করার। আমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম, তিনি আমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলেন এবং শেষ সময়ে আমার হাত স্পর্শ করলেন। তিনি এ-সময় বারবার বলছিলেন, মারা যাওয়ার আগে আমি একটা চমৎকার সিনেমা দেখে যেতে পারলাম। তার এই অনুভূতির জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।

সূত্র:

http://sensesofcinema.com/2002/feature-articles/kim_ki-duk/

http://www.grouchoreviews.com/interviews/118

 

অনুবাদক: কৃষ্ণ কুমার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী।

kumarkrishmcj@gmail.com

বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়। 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন