Magic Lanthon

               

মাহমুদুল হাসান পারভেজ

প্রকাশিত ০৪ ডিসেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ডুবসাঁতার এই মুহূর্তে নিষ্প্রয়োজন

মাহমুদুল হাসান পারভেজ

সাউন্ডট্র্যাকে শোনা যায় ট্রেনের শব্দ। লাইন পারাপার হওয়ার সময় এক নারী ট্রেন দেখে দাঁড়িয়ে যায় এবং অপেক্ষায় থাকে ট্রেনটি প্রস্থানের জন্যে। ঠিক ওই মুহূর্তে মৃদু হেসে ফ্ল্যাশব্যাকে দেখেন, শৈশবে পুকুরে গোসল করার দৃশ্য। সেখানে সে-সমাজের ধরাবাঁধা নিয়ম ভেঙ্গে পুকুরের পানিতে প্রাণখুলে নাচছেন। ট্রেনটি চলে গেলে নারী আপন পথে আবারও যাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রার গন্তব্য হয়তো দোদুল্যমান। এরপর টাইটেল-কার্ড শুরু।

ডুবসাঁতার মূলত রেনুকা নামে এক নারীর মানসিক টানাপোড়েনের কাহিনী। মা ও দুই ভাই নিয়ে তার পরিবার। বড়োভাই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, আর ছোটভাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। রেনুকার বিয়ে হয়েছিলো, কিন্তু বেশিদিন টেকেনি। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাদকাসক্তদের নিয়ে কাজ করেন। তার উপার্জিত আয়ে পরিবার চলে। শরীর ও মন তার পরিবারকেন্দ্রিক। আপন বলতে তার কিছুই নেই। শৈশবের উন্মাদনা সে হারিয়ে ফেলেছে। স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ তার কাছে মরীচিকার মতো।

কাজের খাতিরে পরিচয় হয় ইমরান নামে মাদকাসক্ত এক যুবকের সঙ্গে। এই পরিচয় একসময় প্রেমে পরিণত হয়। স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে রেনুকার আবারও ভাবনা শুরু হয়। সুখময় সময় যেনো আবার ফিরে আসে। আবার জেগে ওঠে তার শরীর ও মন। কিন্তু এক কালবৈশাখী ঝড় স্বপ্নকে পুনরায় লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এক রাতে ইমরান চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা যায়। স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ আবারও মরীচিকায় পরিণত হয়। রেনুকা পুনরায় নিঃশেষ হতে থাকে। এদিকে রেনুকার গর্ভে ইমরানের সন্তান। অন্যদিকে আছে সমাজ, শাসন। উভয় সঙ্কটের জটিলতা নিয়ে সিনেমাটি শেষ হয়।

সিনেমাটি দেখছিলাম আর বারবার মনে হচ্ছিল জীবনের বৈশিষ্ট্য বুঝি এমনই। সুখ আর দুঃখের মাঝেই জীবনের সব খেলা। জীবনকে সুন্দরময় করে তুলতে আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা। সে-চেষ্টা যখন সার্থক, জীবন তখন দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ; ঠিক যেনো নিষ্পাপ শিশুর অনাবিল হাসি। কিন্তু নিছক কোনো দুর্ঘটনায়, অনাবিল হাসি সমুদ্রসমান আঁখির জলে পরিণত হয়। তারপরেও সবকিছু ভুলে সুখের জন্য আবার জীবনযুদ্ধ শুরু হয়। এ-জীবনযুদ্ধে সৃষ্টির আদ্যোপান্ত বিদ্যমান। জীবনযুদ্ধ আছে বলে হয়তো মৃত্যু নয়, জীবন সত্য।

ডুবসাঁতার-এ দেখি ইমরান রাতে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফিরছিলো। পথে তাকে চোর সন্দেহে বাছ-বিচার ছাড়াই গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হয়। প্রায় শেষ দৃশ্যে এক যুবককে বেঁধে পেটায় মহল্লার লোকজন। কেনো পেটাচ্ছে তা স্পষ্ট হয় না। শুধু এটুকু বোঝা যায়, কোনো অপরাধ করার জন্যে হয়তো পেটানো হচ্ছে। দৃশ্য দুটির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে আইন ভাঙ্গার নানা ঘটনার মিল খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না। ঢাকার অদূরে ছয় যুবককে রাতের বেলা ডাকাত সন্দেহে মেরে ফেলে এলাকার লোকজন; ফতোয়া ও ধর্মের দোহাই দিয়ে পেটানো হয় নারীকে। হতাশার বিষয় হলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। র‌্যাবের ক্রসফায়ারে যারা ‘নির্দোষ’, ‘অপরাধী’ সবাই মরছে। অপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে পাখির মতো দিন-দুপুরে গুলি করে হত্যা করছে তারা। সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের হাতে সাংবাদিক নিগৃহীত; আদালতপাড়ায় যুবতীর শ্লীলতাহানি; আদালতের ফটকে বিচারককে পেটানো-প্রমাণ করছে রক্ষক হয়ে উঠছে ভক্ষক। এগুলো নিয়ে ডুবসাঁতার আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে।

তবে তারপরও ডুবসাঁতার নিয়ে আমার কিছু ভিন্ন বোঝাপড়ার জায়গাও আছে। কোনো তাত্ত্বিক বা দার্শনিক জায়গা থেকে নয়; বরং সাধারণ দর্শক সিনেমা যেভাবে দেখে বা উপভোগ করতে চায়, ঠিক ওই জায়গা থেকে কিছু বলার প্রয়োজন অনুভব করছি। আমি মিউজিক-ভিডিও, টিভি-নাটক, টেলিফিল্ম, বিজ্ঞাপন দেখি; কিন্তু সবকিছুর পর সিনেমা আমাকে একটু বেশিই টানে। তাই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়েই দেখি ডুবসাঁতার চলচ্চিত্রটি। এর আগে অবশ্য চতুর্থমাত্রাসাইকেলের ডানা নাটক ছাড়া আমি নূরুল আলম আতিকের কোনো কাজ দেখিনি। ওই দুটি নাটক আমার খুব ভালো লেগেছিলো। টিভি-নাটক এতো সুন্দর হতে পারে এর আগে আমি ভাবতেই পারিনি। যাহোক সমস্যা হলো ডুবসাঁতার নিয়ে; যদিও আমি বারবার বলছি এটি সিনেমা, কিন্তু দেখার সময় আমার বারবার মনে হয়েছে নূরুল আলম আতিকের কোনো টেলিফিল্ম কিংবা নাটক দেখছি। কেনো জানি সিনেমা মনে হয়নি! সত্য বলতে কী, কেনো এমন মনে হয়েছে আমার নিজের কাছে তার সদুত্তর নেই। হয়তো ইমেজ, বিষয়বস্তু, আরোপিত গান তিনটি ডুবসাঁতারকে সিনেমার কাছে নিয়ে যেতে পারেনি। আবার ভেবেছি অনেক চলচ্চিত্রই-তো এমন হয়! তবে ডুবসাঁতারকে সিনেমা হিসেবে ভাবতে না পারাটা হয়তো নেহায়েতই আমার জ্ঞানের অজ্ঞতা বা দুর্বলতা-এটা আমি ধরেই নিচ্ছি। নির্মাতা যেহেতু এটিকে সিনেমা বলছেন, তাই ডুবসাঁতারকে সিনেমা বলতে আমি অনেকখানি বাধ্য। তারপরও হয়তো সময় করে এর উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে।  

আর একটা বিষয় নিয়ে কথা বলার যোগ্যতা যদিও আমার নেই; তারপরও অনেক নাটক, সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে সাহস করে বলছি-আমার কেনো জানি মনে হয়েছে, সিনেমাটির কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও স্পট কোনোটিই ধারালো বা সুপরিকল্পিত ছিলো না। একটি দৃশ্যের সঙ্গে আরেকটি দৃশ্যের সম্পর্ক খুঁজে পেতে আমার কষ্ট হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে সম্পর্কই খুঁজে পাইনি। কাহিনীর প্রয়োজনে নয়, বরং সিনেমার সময় বাড়ানোর জন্য অনেক দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। অনেক জায়গায় মনে হয়েছে সিনেমাটি ঝুলে গেছে; দেখার সময় বহু জায়গায় আমি নিজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আর একটি কথা দিয়ে শেষ করবো। যারা স্বাধীনধারার নির্মাতা হিসেবে দাবি করেন অর্থাৎ, এফডিসির (প্রতিষ্ঠান) বাইরে যারা সিনেমা নির্মাণ করছেন তাদের এক ধরনের প্রবণতা আমার কাছে পরিলক্ষিত হয়েছে। তারা ব্যক্তির মনোজগতের জটিলতা নিয়ে সিনেমা বানাতে বেশি আগ্রহী। ডুবসাঁতার এই প্রবণতার বাইরে আলাদা কোনো সত্তা নয়। তৃতীয় বিশ্বের এই দেশে আমরা এখনই ব্যক্তির মনোজগত নিয়ে সিনেমা বানানোর পরিপক্কতা অর্জন করেছি কি? যেখানে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জাতীয়-আন্তর্জাতিক চরিত্র বা রূপ দোদুল্যমান, সেখানে মনোজগত নিয়ে সিনেমা বানানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে! কেউ কেউ বলবেন, সিনেমা হবে হরেক রকম; থাকবে বিচিত্রতা। আমিও বলি, অবশ্যই বিচিত্রতা থাকবে; থাকবে না কোনো গৎবাঁধা নিয়ম। কিন্তু সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় প্রথা-প্রতিষ্ঠানকে হুমকিতে ফেলার মতো সিনেমা আমরা পাচ্ছি কি? এমন সিনেমা তৈরি হোক যেখানে রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্বায়ন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। তাই এই মুহূর্তে ডুবসাঁতার সিনেমা নিষ্প্রয়োজন।

 

লেখক : মাহমুদুল হাসান পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

mhparvez52@gmail.com


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন