Magic Lanthon

               

সেলিম আহমেদ

প্রকাশিত ২৪ জানুয়ারী ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অগ্নি : কোটি টাকার অস্পষ্ট জ্যামিতি

সেলিম আহমেদ

 

টাইপরাইটারের ইংরেজি বর্ণমালার কি-বোর্ড নকশা ১৮৭৪ সালেই বাণিজ্যিকভাবে শেষ হয়েছিলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তৈরি হয়েছিলো এর বাংলা কি-বোর্ড নকশা; ১৯৬৫ সালে জনাব মুনীর চৌধুরী প্রথম বৈজ্ঞানিক বাংলা কি-বোর্ডের নকশা করেছিলেন। আমাদের ছেলেবেলাটা কেটেছে অপটিমা মুনীর বাঙলা টাইপরাইটার দেখে। তারপর আরো দীর্ঘ সময়ে পদ্মার পানি অনেকটা গড়িয়েছে বা ক্ষীণ হয়েছে ধারা; ১৯৮৩ সালে ম্যাকিন্টশ কম্পিউটারে জনাব সাইফ শহীদ কম্পিউটারের জন্য বাংলা কি-বোর্ড নকশা ও বাংলা ফন্ট তৈরি শুরু করেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ধাপে, মন-প্রাণ তখন শহীদ লিপিতে। সব জেলার নামে ফন্ট তৈরি হচ্ছে, সব নদীর নামে বাংলা ফন্ট হচ্ছে; ভীষণ আবেগতাড়িত হয়ে সেই কাজ করা।

১৯৮৫ সালে শহীদ লিপি ব্যবহারের জন্য সবার কাছে পৌঁছে যেতে থাকে, আর আমি থিতু হয়ে সাধারণ মানুষের শিল্পে নিয়োজিত হবো ভেবে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক-এর চাকরিতে যোগ দেই; ভাস্কর্য থেকে ম্যাকিন্টশ কম্পিউটার, তারপর কম্পিউটারের ফন্টোগ্রাফ দিয়ে বাংলা ফন্ট তৈরির নকশা থেকে কারুশিল্পের নকশা। মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি থেকে আড়ং ব্র্যাকের নিয়ন্ত্রণে এসেছে, আড়ং তৈরি হচ্ছে তখন। সোবহানবাগের ভাড়া নেওয়া ছোটো বাড়িতে ডিজাইনার হিসেবে কাজ করছেন সঞ্জয় ভাটনাগর ও তার স্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ পরীক্ষা ছিলো সমাজতত্ত্বের মৌখিক, তারপর দ্রুত পৌঁছে গেছি মহাখালী ব্র্যাক অফিসে চাকরির মৌখিক পরীক্ষায়। আমি ঠিক পরের দিন চাকরিতে যোগদান করি ডিজাইনার দম্পত্তির কাউন্টারপার্ট হয়ে। কারুশিল্পী সংগ্রহ করতে তার পর আমি আর সঞ্জয় ভাটনাগর সারাদেশ ঘুরছি। আমরা বংশাই তীরের কাকরান হয়ে মানিকগঞ্জের পালোরা, পালোরা হয়ে কুষ্টিয়া বা শরীয়তপুরখুঁজে দেখছি আমাদের দেশের মৃৎশিল্পীদের। রাজশাহী সেরিকালচার বোর্ডের সিল্ক ফ্যাক্টরির কী অপার সম্ভাবনা, কতো কারিগরি সুবিধা নিয়েও শুধু পরিকল্পনার অভাবে আর অসুস্থ রাজনীতিতে কেমন সর্বশান্তসব দেখেছি।

এমন সময় পৃথিবীর বিভিন্ন কোণ ঘুরে হঠাৎ উড়ে আসলো দারুণ একজন ইহুদিজন পল, তার সঙ্গে ঘুরেছি সারাদেশ। সাদা ল্যান্ডক্রুজারটি এখনকার দিনের গাড়ির মতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিলো না, মে-জুন মাসের গরমে ঘামছি আর জন পলকে বলছি পুণ্ড্রনগরের কাহিনি। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীরঘেরা রাজধানীযা পুণ্ড্র সভ্যতা। ভাস্কর্য, নৃত্য, সঙ্গীত, লোকশিল্প, সাহিত্য, গাঁথাকাহিনি, স্থাপত্য, মৃৎশিল্প, বয়ন, বনজ, জলজ, কুটিরশিল্পের ঈর্ষণীয় উদ্ভাবনে, বিশ্ব-বাণিজ্য, যুদ্ধ, শান্তি স্থাপনে, দুর্গ নির্মাণে অসাধারণ নৈপুণ্য ও দক্ষতার অধিকারী একটি জাতি পুণ্ড্র। আমি গল্পের মতো পুণ্ড্রদের কথা বলি, আর জন পল আমাকে ডকুমেন্টেশনের কথা বলেন। তিনি আমাকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন তার আশাই পেনটাক্স কে ১০০০ এস এল আর ক্যামেরাটি।

অল্প টাকা বেতন, তাই আমি কিনতে পারি শুধু এফ ডি সি থেকে গোপনে চলে আসা কাটা সাদা-কালো ফিল্ম। সারাক্ষণ ছবি তুলছি, মানুষ-প্রকৃতি-পুরাতত্ত্বের। আমি প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছি ভাস্কর থেকে নকশাকারে; এই যে ছবি তোলার অভ্যাস তাও কিন্তু রয়ে গেলো। আমি টাকা জমিয়ে কিনে ফেললাম আশাই পেনটাক্স কে ১০০০, যেখানে যাই সেখানেই ছবি তুলি। ছবি জমছে, নেগেটিভ ডেভেলপ করে ছবি দেখবার যে আকুতি তা পূরণ করছি বেতনের টাকার একটি বড়ো অংশ দিয়ে। ছবি জমছে, মানে টুকরো টুকরো আমার পৃথিবী জমছে। আমার এই ছবি তোলাই কিন্তু প্রতি ক্লিকে আমাকে ডিজাইনার বানিয়ে দিচ্ছে, তা বুঝেছিলাম অনেক বছর পর। ঈদের পাঞ্জাবিতে রঙিন সুতায় তোলা নকশা আসছে হয়তো অনেক আগে তোলা কোনো ছবির পুণ্ড্রদের টেরাকোটা থেকে, আবার লঙ্ স্কার্টের পাড়ে হয়তো ক্রস স্টিচে পাহাড়পুরের কোনো টেরাকোটার জ্যামিতিক বিন্যাস। 

সে বিচিত্র অভিজ্ঞতা, নগরায়ণে কতো শিল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে, কতো শিল্পী অভাবে পেশা পরিবর্তন করছে তা প্রতিদিন দেখেছি। তারপর মৃতপ্রায় কোনো কারুশিল্পী দলকে অনুপ্রাণিত করে আগাম টাকা দিয়ে একটা উইভিং ডিজাইন করিয়ে ঈদের জন্য কিছু কাপড় তৈরি করলাম। প্রশান্তি হলো, মৃতপ্রায় কারুশিল্পীরা আশার আলো দেখবে আর এ দেশের ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যোগ হবে। সবকিছু ভালোই চলছে, নতুন নতুন ভাবনা আসছে; হঠাৎ দেখি শহরের এক দোকানে আমার পাঞ্জাবির উইভিং ডিজাইনের কাপড়টি দিয়ে তৈরি সালোয়ার-কামিজ ঝুলছে। আমার ডিজাইন আমার অনুমতি ছাড়া অন্য একটি দোকানে বিক্রি হয় কী করে? এটা ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি, আর এই চুরি করে হজম প্রক্রিয়া হলো পাইরেসি।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পায় ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত চলচ্চিত্র অগ্নি। প্রথম দিনে চলচ্চিত্রটি ব্যবসা করে এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা এবং দ্বিতীয় দিনে এক কোটি ১৫ লক্ষ টাকা। এর আগে কোনো বাংলা চলচ্চিত্র এই পরিমাণ আয় করতে পারেনি। অগ্নি মুক্তি পায় ঢাকাসহ সারাদেশের ৯২টি প্রেক্ষাগৃহে। ঢাকার বাইরে উল্লেখযোগ্য প্রেক্ষাগৃহগুলোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের নিউ মেট্রোতে প্রায় আড়াই লক্ষ, ডেমরার রানীমহল-এ প্রায় পৌনে দুই লক্ষ, টঙ্গীতে প্রায় সোয়া দুই লক্ষ, যশোরের মণিহার-এ প্রায় দুই লক্ষ, শ্রীপুরের চন্দ্রিমায় আড়াই লক্ষ, সিলেটের নন্দিতায় দেড় লক্ষ, ময়মনসিংহের ছায়াবানীতে পৌনে দুই লক্ষ এবং রাজশাহীর উপহার-এ দেড় লক্ষ টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে।

একই দিনে মুক্তি পেয়েছে অনুদানের চলচ্চিত্র আকাশ কত দূরেজীবনঢুলী। ১৮ ফেব্রুয়ারি স্টার সিনেপ্লেক্স-এ আকাশ কত দূরের প্রদর্শনীতে ছিলো ১১ জন দর্শক। অন্যদিকে কোনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না দিয়ে দেশের বিভিন্ন অডিটোরিয়ামে প্রদর্শন হচ্ছে জীবনঢুলী। পরিচালক, শিল্পী, কলাকুশলীদের পরিচিত ও আত্মীয়স্বজন ছাড়া জীবনঢুলী তেমন কোনো সাড়া ফেলতে পারেনি সাধারণ মানুষের মধ্যে।

তার মানে অগ্নি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য আশাজাগানিয়া। চলচ্চিত্রটি বাংলা চলচ্চিত্রের সুদিনের বার্তা বহন করে। এই বাংলা চলচ্চিত্র অগ্নির পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী। প্রযোজক মোহাম্মদ আবু বকর। প্রযোজনায় সেভেন স্টার ফিল্মস। জাজ মাল্টিমিডিয়া ছিলো পরিবেশক। কাহিনি, সংলাপ, চিত্রনাট্য রচনা করেছেন আব্দুল্লাহ জহীর বাবু।

যেকোনো চুরি গর্হিত; প্রথম লোকসান চুরি হয়ে যাওয়া, আর দ্বিতীয়ত এই চুরি করা জিনিসপত্র চোরের ব্যবসায় একশো ভাগ কাঁচামাল হয়ে সামগ্রী হওয়া। দুই ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৫১ সেকেন্ডের অগ্নি ইউটিউবে এইচডি ভার্শন চলে এলো, অথচ তা নিয়ে পরিচালক-পরিবেশক কেউ কোনো কথা বললো না। আমার তৈরি জামা-কাপড় এমনকি শতরঞ্জির ডিজাইন নকল হয়ে যাচ্ছে, আমার ভীষণ মন-খারাপ হয়ে গেলে সঞ্জয় ভাটনাগর বলতেন, ভালো তো, তুমি ডিজাইনার হয়ে উঠছো। অগ্নি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রপ্রযোজক এমনই দাবি করেছিলো। সেই চলচ্চিত্রের গরম গরম পাইরেসি ইউটিউবে প্রদর্শন হচ্ছে, জানি না কোন্ তৃপ্তি থেকে পরিচালক-প্রযোজক তা মেনে নিয়েছিলেন। অগ্নির ফার্স্ট লুক ১৭ অক্টোবর ২০১৩-তে ফেইসবুকে রিলিজ দেওয়া হয়েছিলো এবং প্রথম দিনে দুই লক্ষের বেশি বার এটি দেখা হয়। এর ফুল ট্রেইলার ফেইসবুকে দেখা যায় ১ ডিসেম্বর ২০১৩-তে, ট্রেইলারটি দেখা হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষ বার, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক।

অগ্নির শুরুতেই লাল লঙ্ ড্রেস আর কালো জুতায় একটি মেয়ে আসে মি. কামালের সঙ্গে দেখা করতে। কামাল তখন ১১টা সিসিটিভির স্ক্রিনে জগতের সবকিছু দেখছিলেন। মেয়েটার চেহারা কেমন, তোর চেয়ে ভালো না খারাপএ ধরনের অবাঙালি উচ্চারণে বাংলায় কথা বলেন মি. কামাল। তারপর কামাল সাহেবের প্রাইভেট চেম্বারে যাওয়ার অনুমতি মেলে সিনথিয়ার। লিফ্টের চারে রওনা দেওয়ায় চলচ্চিত্র শুরুর এক মিনিট ৪৩ সেকেন্ড পর সিনথিয়া লিফ্ট থেকে নামতে গেলে দর্শক প্রথম তার মুখ দেখবার সুযোগ পায়। লাল রঙা প্রাইভেট ঘরের লাল দরজা খুলে, লাল লঙ্ ড্রেসে সিনথিয়াকে দেখতেই কালো সানগ্লাস পরিহিত কামাল সাহেব বলে ওঠেন, ওয়াও সেক্সি...। ফার্মের মুরগিতে অরুচি ধরে গেছে, এখন দেশি মুরগি চাই। স্মার্ট সেক্সি লেডি, জাস্ট লাইক ইউ।

কামালের দুর্গে আটকা পড়ে যাওয়া সিনথিয়া চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বলতে থাকেন, ...তুই কী ভেবেছিস? আমাকে তোরা এখানে ধরে এনেছিস? নো কামাল নো। আমি এখানে আসতে চেয়েছিলাম, দেখতে চেয়েছিলাম শেয়ালের আস্তানাটি কোথায়। তোর দৌড় কতোটুকু। ...প্রথমে ফাটাবো তোর মাথা। এই সব সংলাপের পর সিনথিয়া কামাল ও বাকি দুজনকে একা ঘায়েল করতে থাকে; কামালকে মেরে ফেলার জন্য সিনথিয়া হাতুড়ি হাতে তুলে নেয়। তখন নেগেটিভ ইফেক্টে দেখা যায়, একজন নারী ও একজন পুরুষকে তিনজন আততায়ী গুলি করে হত্যা করছে। এই দৃশ্য সিনথিয়াকে আরো উত্তেজিত করে তোলে, তিনি হাতুড়ি দিয়ে মাথায় পর পর আঘাতে কামালকে হত্যা করেন। এ সময় বন্ধ দরজায় কামালের সুশিক্ষিত বাহিনী আঘাত করতে থাকে, কিন্তু খুব সস্তা-নরম ছিটকিনি ভেঙে ঘরে ঢুকতে বাহিনীর লম্বা সময় লাগে; ফলে এই সুযোগে ফলস্ ছাদের এসি ডাকটিং দিয়ে নিরাপদে চলে যেতে পারেন সিনথিয়া।

কামাল সাহেবকে খুন করে পুরো আস্তানা ধ্বংস করে সিনথিয়া বাইরে এসে দাঁড়ালে (আট মিনিট ৪৩ সেকেন্ড) পর্দায় বাংলা ও ইংরেজিতে নাম ভেসে ওঠে অগ্নি। চলচ্চিত্রের ১০ মিনিট তিন সেকেন্ডে ভেসে ওঠে অভিনয়ে : মাহিয়া মাহী, আরেফিন শুভ, মিশা সওদাগর, আলীরাজ, কাবিলা, ইফতেখার চৌধুরী। আবহ সংগীত : ইমন সাহা। গীতিকার : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, রবিউল ইসলাম জীবন, সুদীপ কুমার দিপ, শফিক তুহিন, আবদুল আজিজ। সংগীত পরিচালক : শফিক তুহিন, আহমেদ হুমায়ুন, অদিত। নৃত্য পরিচালনা : মাসুম বাবুল, তানজিল। চিত্রগ্রহণ : সাইফুল শাহীন।

রাতের দৃশ্য, একটি খোলা ল্যাপটপের সামনে সিনথিয়াকে দেখা যায়, কী সব গ্রাফিকের পর ফোন তুলে নেয় সিনথিয়া। ডায়াল করে কানে ধরতেই ওই পাশের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, বল তানিশা। সিনথিয়া ওরফে তানিশা বলেন, মামা, আমাকে থাইল্যান্ড যেতে হবে। মামা বলেন, থাইল্যান্ড, হঠাৎ করে থাইল্যান্ড কেনো? তানিশার জবাব, আমার সব টার্গেট থাইল্যান্ডে। এর পরের দৃশ্যে এয়ারপোর্ট এবং মামার সঙ্গে কথোপকথন; এয়ারক্রাফ্টে উঠে বসবার আগেই সুরে সুরে শোনা যায় আমি অগ্নি... গানটি। সুইমিংপুলে দুই নারীসহ জলকেলিরত একজন ফোনে উত্তর দেয়হা হায়দার বলো। গুলজারকে সবার সিকিউরিটির কথা বলে হায়দার। কামালের মৃত্যু সংবাদের পর, ইন্টারকাটে স্লো-মোশনে ছাদে একজনের দৌড়ানোর দৃশ্যসে ড্রাগন। ড্রাগন ২০০৬, ০৭, ০৮পর পর তিনবার থাই বক্সিং চ্যাম্পিয়ন, যেকোনো অস্ত্র চালাতে পারদর্শী, মা থাই আর বাবা বাংলাদেশি। ড্রাগন দেশের খবর রাখে।

গুলজারের কথায় বোঝা গেলো গাউস (আরেক পার্টনার) শুধু নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে না। এদিকে রাতে তানিশা ল্যাপটপে গাউসকে খুঁজে পায়। গাউসের খাটে শুয়ে থাকা আর দুর্বল অভিনয় দেখে বোঝা সহজ হয়ে যায় যে, সে মরে যাবার জন্য অপেক্ষা করছে। ইন্টারকাটে ড্রাগন মোটরবাইকে এদিকেই আসছে তা বোঝা যায়। যখন গাউসকে জবাই করে তানিশা, তখন আর একবার নেগেটিভ ইফেক্টে দেখে একজন নারী ও একজন পুরুষকে আততায়ী তিনজন গুলি করে হত্যা করছে। গাউসের গার্ডদের শিক্ষা দিয়ে চলে যাবার সময় তানিশা ড্রাগনের মুখোমুখি হয়, মোটরবাইক তাড়া করে ড্রাগন ব্যর্থ হয়। পালিয়ে যায় তানিশা, এরপর বাংলানাইট; তানিশার গান আর ড্রাগনের নায়কোচিত হাঁটা-চলা।

তানিশার অতীততার বাবা-মাকে গুলজার আর গুলজারের লোকজন গুলি করে মেরে ফেলে। তানিশা পালিয়ে আসে মামা মার্শালের কাছে। ছোটো সেই বালিকা নিরাপত্তা চায় না, চায় প্রতিশোধ নিতে। তানিশা মামাকে বলে, আমি অগ্নি হতে চাই।

চলচ্চিত্রের গল্প এ পর্যন্ত যা দেখানো হয়েছে তা হয়তো আমাদের জানা গল্প, সেই পুরনো রদ্দি-পচা মাল। এরপর একে একে গুলজারের লোকের ওপর হামলা হবে, ড্রাগনের শক্তি কারো কাছে আর নির্ভরযোগ্য মনে হবে না। মেয়েটির সঙ্গে সামাজিকভাবে দেখা হবে নায়কের, তবে অন্য পরিচয়ে। অগ্নির এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময়ে নায়ক-নায়িকার প্রেমে গান শুরু হয়। তানিশার প্রয়োজন ড্রাগনের সেফ হাউজের ঠিকানা, এ নিয়ে অবশ্য দর্শকের খুব বেশি অপেক্ষা করতে হয় না; গান শেষ হতে না হতেই সেই ঠিকানা পেয়ে যায় তানিশা। এমনিতে গল্পের গতি খুব ধীর লয়ের, তবে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ-ঢাকা-মোহাম্মদপুর-জহুরীমহল্লা হয়ে আবার থাইল্যান্ডে দ্রুত পৌঁছে যায় হায়দার। তানিশার মামা প্রাণ হারায় হায়দারের হাতে, তানিশার পরিচয় জেনে ফেলে ড্রাগন। ফলে তানিশাকে ঘিরে নায়ক-ড্রাগনের দেখা স্বপ্ন ফিকে হয়ে যায়। ড্রাগনের গভীর প্রেম, বিপরীতে তানিশার প্রতিশোধের আগুন; নায়কের মন খারাপের পালা। এবার প্রাণ হারায় নায়কের মামা, হায়দারের হাতে। বাঙালির জীবনে মামার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, মামা নাই যার সে দুর্বল, ভীষণ অসহায়। ছোটোবেলায় বাবা-মার মৃত্যুর পর ডিবি পুলিশ হায়দারের হাত থেকে তানিশা বেঁচেছিলো, কিন্তু এইবার হায়দার তার চেয়ারে আর একজনকে বসিয়ে বোকার মতো তানিশাকে অস্ত্রের মুখে কন্ট্রোলে আনে; খবর পৌঁছে যায় গুলজারের কাছে। তানিশা আর ড্রাগনের হাতে পরাজিত হয় হায়দার-গুলজার পার্টনারশিপ। তারপর নায়ক-নায়িকার সেই মিলন।

কেনো এ ধরনের গল্প তৈরি করেন গল্পকার? দেশের প্রশাসন অপরাধীদের পার্টনার, তাই বাবা-মার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিজেকেই নিতে হবে অথবা সামাজিক বিশ্বাসযোগ্য কোনো ঘটনার গল্প দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখছে নাতাই? নাকি পাবলিক খায় নাএ কথা অবশ্য এফডিসি আর কাকরাইল ফিলিম পাড়ায় চালু আছে। অথচ অতীতের অবিচার আর অত্যাচারের জবাব নারীর নিজ হাতেই সম্পন্ন করার কাহিনি এফডিসির চলচ্চিত্রে হয়ে গেছে সেই ৭০ দশকের শেষে শাবানা অভিনীত দস্যুরাণীতে; প্রচুর দর্শকও ছিলো সেই চলচ্চিত্রে। কাকরাইল ফিলিম পাড়ার আজ আর কিছুই নাই, যেমন নাই এফডিসির সেই হাজার হাজার ওয়াটের বাতির ঝিলিক।

আজও চলচ্চিত্রের ব্যবসা আর নির্মাণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সিংহভাগ স্কুল-কলেজের চৌকাঠ দেখে নাই। একধরনের নিয়মতান্ত্রিক চিত্রভাষায় দক্ষ হয়ে তারা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকে। পাবলিক খায়, পাবলিক খায় নাএভাবেই চলতে থাকে এ দেশের মূলধারার চলচ্চিত্র। সমাজ, সময়ের কোনো ডকুমেন্টেশন থাকবে না গল্পে? সহজভাবেই চলচ্চিত্র নৃতত্ত্বের বিষয়, এর কেন্দ্রে থাকে মানুষ আর মানুষের জীবন। পর্দায় মানুষগুলোকে তুলে ধরে দর্শকের মনে-মাথায় এক সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। অথচ শুধু কাহিনি বিন্যাস মৌলিক নয় বলে এ হয়ে উঠবে না ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি? এতটা দীনতা কেনো?

আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে দুর্বল অংশটিই বিষয়বস্তু, প্রযোজক-পরিচালকের সেই এক কথাগল্প নিয়ে কোনো সময় দেওয়া যাবে না। গল্প নিয়ে আলোচনার কী আছে? দু-চারটে তামিল-হিন্দি চলচ্চিত্রের সিকোয়েন্স জোড়া দিলেই তো গল্প হয়, আর সংলাপ নিয়ে এতো ভাবনার কিছু নাই। সবচেয়ে সাদৃশ্যবিহীন শিল্পটিই সংলাপ, একদম অবাস্তব আর অশ্লীল। যেহেতু চারিদিকে হাত-পা ছড়িয়ে গল্প-সংলাপ জোগাড় করা, তাই রচয়িতার এই রচনা নিয়ে কোনো দায়িত্ব নাই, উচ্চাশা নাইএটাকে রচয়িতা নিজেই ইন্টালেকচুয়াল প্রপার্টি মনে করে না। তামিল-হিন্দির ভিতর বেড়ে ওঠা জ্ঞানে নিজের অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো পৃথিবীপুরোটাই অন্তঃসারশূন্য, ফাঁকা। প্রযোজক-পরিচালক দিন-রাত আলোচনা করেন নায়িকা কে হবে, নায়ক কে হবে। হঠাৎ প্রযোজক চিৎকার করে ওঠেনআমার হাতে ওমুক নায়িকা আর তমুক নায়ক আছে; পরিচালক ভাই পাঁচটা গান রেডি করেন, বিদেশে শুটিং হবে। আমাদের দর্শকের সুবিধা হলো এরা এখন বিশ্বদর্শকের সমান সুবিধা পায়, তামিল-হিন্দি চলচ্চিত্র দেখে। সুতরাং মনে রাখতে হবে, তামিল বা হিন্দির মতো হলে বাংলা চলচ্চিত্র কেউ দেখবে না বরং তামিল-হিন্দিটাই দেখবে।

অগ্নির অভিনয়, শিল্পনির্দেশনা এসব কোনো কিছুই আলোচনার সীমায় আসে নাই। চিত্রগ্রহণ, মানে ক্যামেরা অপারেশন কোথাও কোথাও চমৎকার। প্রযোজক দাবি করেছিলেন, সবচেয়ে ব্যয়বহুল বাংলাদেশি চলচ্চিত্র এটি। নাহ্, তেমন কোনো নিদর্শন দেখা গেলো না অন্তত চলচ্চিত্রে। গল্পের প্রয়োজনে থাইল্যান্ডে যেতে হয়েছে, তা খুব ব্যয়বহুল না; কারণ দেশের বাইরে গেলে ছোটো ইউনিট টিভি-নাটকের মতো চলচ্চিত্র তৈরি করে, চলচ্চিত্রিক কিছু তৈরি হয় না। গল্প থাইল্যান্ড যায় কেনো? নতুন লোকেশন, ফুর্তির জায়গা। তানিশা সেফ হোমে গুলি করতে করতে নেমে আসে, স্পেশাল ইফেক্ট ভালো কিন্তু নেমেই তার চলাফেরা ওই নেমে আসার স্মার্টনেসের সঙ্গে মানায় না। কিছু মারামারির দৃশ্য আছে, মনে রাখবার মতো তেমন কিছু না। তাহলে টাকা গেলো কোথায়?

এ সিনেমার অ্যাকশনের ছোটো ছোটো অংশ ফেইসবুক বা ইউটিউবে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিলো। সবাই ভেবেছিলো একদম নতুন কিছু আসছে। কিন্তু না, আশা ভঙ্গ হয়েছে; দর্শক প্রতারিত হয়েছে, দীর্ঘশ্বাস শুধুই নিরাশার। অথচ প্রযোজক দাবি করছে ব্যবসাসফল; ভালো, অনেকদিন পর কোনো চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলো। বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে বাণিজ্যই আসল কথা, লগ্নি করা টাকা সুদে-আসলে ঘরে ফিরবে। মুক্তির খুব অল্প সময়ে এইচডি ফরমেটে অগ্নি ইউটিউবে চলে এলো, তা আজও কেউ বন্ধ করতে উদ্যোগী হলো না। এটা নিশ্চয়ই পাইরেসি অথবা বিজ্ঞাপনের নতুন মাত্রা। কারণ এই রেজ্যুলেশনের ফোল্ডার এসেছে কর্তৃপক্ষের উৎসাহ বা সম্মতিতে, প্রেক্ষাগৃহের চুরি করা ক্যামেরা প্রিন্ট এটা নয়। তবে কি পরিচালক একধরনের নিজের প্রচারণায় নেমেছেন? আগামী কয়েক বছর তার অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব থাকবে? প্রযোজক এ চলচ্চিত্র কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চান? পরিবেশক নিজে একসঙ্গে দুধরনের ব্যবসা করছেন না তো! পরিবেশনা এবং পাইরেসি?

আমাদের সব উদ্যোগ কি আমাদের প্রতিপক্ষ হবে? নাকি সবকিছুই আমাদের প্রতিকূলেই আছে, আমরা বুঝতে পারছি না। শেষে একটি বিজ্ঞাপনের কথা খুব মনে পড়ছে, না লিখে আর পারলাম না। ব্রিটিশ শেল অয়েল কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপন, কাগজের বেশি অংশ জুড়ে আছে একটি ছবি। সেখানে আকাশ, পাহাড়, নদী, বৃক্ষরাজি, এক কথায় দারুণ নিসর্গ। পাশে লেখা, Wouldn’t you protest if Shell ran a pipeline through this beautiful countryside?

They already have!

 

লেখক : সেলিম আহমেদ, স্নাতক করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে ভাস্কর্যে। দীর্ঘ সময় হস্তশিল্প, ফ্যাশন ও গ্রাফিকের সঙ্গে তার বসবাস। বর্তমানে তৈরি হচ্ছেন চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্য।

selim24march@yahoo.com

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন