Magic Lanthon

               

গোলাম কিবরিয়া জুয়েল ও হাসানুর কবির

প্রকাশিত ১৭ নভেম্বর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

সভ্যতার সঙ্কট, কবীর সুমনের সভ্যতা ও সত্যজিতের আগন্তুক

গোলাম কিবরিয়া জুয়েল ও হাসানুর কবির


‘‘পূর্বতম দিগন্তে যে জীবন আরম্ভ হয়েছিল তার দৃশ্য অপর প্রান্ত থেকে নিঃসক্ত দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি এবং অনুভব করতে পারছি যে, আমার জীবনের এবং সমস্ত দেশের মনোবৃত্তির পরিণতি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে।’ জীবনের প্রথম ভাগে রবীন্দ্রনাথ যেখানে সভ্য জগতের মহিমা ধ্যানে একান্ত মনে নিবিষ্ট ছিলেন, সেখানে সায়াহ্নে এসে সভ্য নামধারী মানব আদর্শের বিকৃত রূপ দেখে এভাবেই কষ্ট পেয়েছিলেন। সভ্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি। আর এই ভাবনারই ফসল ‘‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধটি। অন্যদিকে আগন্তুক সত্যজিৎ রায়ের শেষ চলচ্চিত্র। শুরু করেছিলেন সেই পথের পাঁচালী দিয়ে ১৯৫৫ সালে। উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন ইতালিয় নব্যবাস্তববাদ ধারার চলচ্চিত্র বাইসাইকেল থিভস্‌ দেখে। যাক সেসব কথা। শেষ চলচ্চিত্রে ফিরে আসি, মানে আগন্তুক-এ। সত্যজিৎ রায়ের যে ছয়টি চলচ্চিত্রের কাহিনী তার নিজের লেখা, আগন্তুক এর মধ্যে অন্যতম। ধারণা করা হয় এই চলচ্চিত্রে তিনি তার মনের কথা সবচেয়ে খোলাখুলিভাবে বলতে চেয়েছেন। 

জীবন সায়াহ্নে রবীবাবুর সভ্যতার সঙ্কট আর মানিকবাবুর (সত্যজিতের ডাকনাম) আগন্তুক-এর মধ্যে বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ব্যাপারটা হয়তো কাকতালীয়, তারপরও লক্ষ্যণীয় হলো দুজনেই জীবনের শেষ বেলায় এসে সভ্যতা নিয়ে সঙ্কটে পড়েছেন। প্রশ্ন তুলেছেন সভ্যতা নিয়ে। শিল্প-সাহিত্যের দুই জগতের দুই বাসিন্দার এই চিন্তা আমাদেরও সঙ্কটে ফেলে দেয়। আজ এই সময়ে এসে আমরাও প্রতিদিন প্রতিক্ষণ ভাবি ‘সভ্যতা’ জিনিসটা আসলেই কী? তাই কবির সুমনও রবীঠাকুর ও সত্যজিতের মতো সভ্যতা নামক মরীচিকাকে খুঁজে ফেরেন তার গানে-

অরণ্যে দিনরাত্রি

আমি চলচ্চিত্রযাত্রী

আমি শ্যুটিং করতে আসি

আমি সভ্যতা ভালোবাসি

আছে সভ্যতা কোন্‌ খানে

খোঁজ উন্নয়নের মানে

 

সভ্যতা, সেকি পদ্ম পাতার শিশির বিন্দু

ইংরেজি সিভিলাইজেশন শব্দের বিপরীতে বাংলায় সভ্যতা শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এর যথার্থ প্রতিশব্দ পাওয়া বেশ কঠিন। সভ্য হওয়া মানে বোঝায় উন্নত, মার্জিত হওয়া, ‘‘অভদ্র’ রীতি-নীতির পরিবর্তে ‘ভদ্র’ আচার গ্রহণ করা। সাধারণভাবে বলা যায়, সভ্যতা শব্দটি বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয় কোনো সমাজ, দল, অথবা কোনো গোষ্ঠীর ওপর। আর এর বিপরীতে যে অসভ্য অবস্থায় মানুষ প্রায় পশুর মতো জীবনযাপন করে, তাকে বলা হয় বর্বরতা। আর এর ঠিক উল্টো অবস্থাটাই সভ্যতা। আসলে সভ্যতার একটি ভৌগোলিক বিশেষত্বও আছে। একই আচার বা প্রথা কোথাও সভ্যতা, কোথাওবা অসভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত হয়। স্থান, কাল, পাত্রভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয় এই সভ্যতা। এটা হয় কখনও এলাকা, কখনও জাতি, গোত্র বা ধর্মের ওপর ভিত্তি করে।

গ্রিক, মায়া, মিশরীয়, চীনা বা ভারতীয় এ-রকম কতো সভ্যতাই না গড়ে উঠেছে আবার ধ্বংসও হয়ে গেছে। আবার অনেকে অন্যকে সভ্য করার নামে দেশে দেশে তাদের উপনিবেশবাদকে জায়েজ করেছে, এখনও করছে। এভাবেই কালের পরিক্রমায় গড়ে উঠেছে বর্তমানের ‘আধুনিক সভ্যতা’। কথিত এই আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো পাশ্চাত্যে তথা আমেরিকা ও ইউরোপে। আর সেই সভ্যতাই পরে ছড়িয়েছে সারা দুনিয়ায়, হয়ে উঠেছে আদর্শ। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ নিজেও নির্দ্বিধায় স্বীকার করে নিয়েছেন পাশ্চাত্যের প্রতি তার এক সময়ের দুর্বলতা, পক্ষপাত এবং পরবর্তী সময়ে মোহভঙ্গের কথা। কবি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।’

আজকে সভ্যতার দাবিদার এই মানুষগুলোই অন্যদের সভ্য করার ধোঁয়া তুলে দেশে দেশে আগ্রাসন চালাচ্ছে। দিনের পর দিন নতুন পথে করছে ভার্চুয়াল শোষণ, চলছে মনস্তত্বে বসতি। তারাই মনুষ্যত্বের সব নীতিবোধকে উপেক্ষা করে যুগ যুগ ধরে মানুষের সব অধিকার হরণ করে এক শৃঙ্খলের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছিলো। প্রশ্ন জাগে আজকের বিশ্বের সীমাহীন বৈষম্য, অস্থিরতা, হানাহানি, একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা, পশ্চিমাদের মোড়লিপনা যদি রবীন্দ্রনাথ দেখতেন তাহলে কেমন হতো তার প্রতিক্রিয়া? তিনি কীভাবে তার মানবধর্ম দিয়ে রোধ করতেন এই মানবিক বিপর্যয়? কিন্তু তারপরও মানবতার কবি সভ্য করার নামে দেশে-মহাদেশে যুদ্ধ, লুণ্ঠন, শোষণ দেখে চুপ করে থাকতে পারেননি। ১৯৩৭ সালের মার্চে স্টেটসম্যান পত্রিকায় স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ একটি বিবৃতি দেন। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানান, ফ্যাসিস্ট শক্তির বর্বরতার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলনের। তৎকালীন স্পেনের জাতিগত কুসংস্কার, দস্যুবৃত্তি এবং যুদ্ধকে কর্তৃত্বশালী করার যে প্রবণতা ছিলো কবি তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘‘স্পেনীয় জনগণের এই চরম দুঃখ-দুর্দশার দিনে আমি বিশ্বমানবের বিবেকের কাছে আবেদন জানাই। স্পেনের গণফ্রন্টকে সাহায্য করুন, জনগণের সরকারকে সাহায্য করুন। ...বর্বরতায় নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে সভ্যতাকে।’

কিন্তু কেনো তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা আজ বর্বরতায় নিমজ্জিত হতে চলেছে? মানুষ অসভ্য অবস্থা থেকে ক্রমেই সভ্য হয়, কিন্তু কথিত অধুনা সভ্যতা কেনো আজ সভ্য অবস্থা থেকে বর্বর অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে? কেনো আগন্তুক-এর মনমোহনকে সভ্যতা বুঝতে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়? মানবতার কবি কেনো জীবন সায়াহ্নে সভ্যতা নিয়ে সঙ্কটে পড়েন? কবির সুমনই বা কেনো সভ্যতা কোন্‌খানে আছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন? তাহলে কি আমাদের অহংকারের বস্তু এই সভ্যতা নিছকই পদ্ম পাতার শিশির জল?

 

সুমন বলেন, আছে সভ্যতা কোন্‌খানে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ প্রত্যক্ষ করেছিলেন আর দ্বিতীয়টি শেষ হওয়ার আগেই তিনি পরলোকে যান। তাই এর ফলাফল দেখার দুর্ভাগ্য তার হয়নি। দেখলে হয়তো আমরা তার উপলব্ধির পূর্ণ প্রতিক্রিয়া পেতাম। ‘‘সভ্যতার অ্যাটমবোমা’ দেখে তার প্রতিক্রিয়া হয়তো ভিন্ন রকমের হতো। অবশ্য তার আগে যতোটুকুই দেখেছিলেন তাতেই তার মোহমুক্তি ঘটে। আর এরই প্রতিফলন দেখা যায় জীবন সায়াহ্নে তার লেখায়। রবীঠাকুর লিখলেন, ‘ভারতবর্ষ ইংরেজের সভ্যশাসনের জগদ্দল পাথর বুকে নিয়ে তলিয়ে পড়ে রইলো নিরুপায় নিশ্চলতার মধ্যে। চৈনিকদের মতন এতবড়ো প্রাচীন সভ্য জাতিকে ইংরেজ স্বজাতির স্বার্থসাধনের জন্য বলপূর্বক অহিফেনবিষে জর্জরিত করে দিলে এবং তার পরিবর্তে চীনের এক অংশ আত্মসাৎ করলে। এই অতীতের কথা যখন ক্রমশ ভুলে এসেছি তখন দেখলুম উত্তর-চীনকে জাপান গলাধঃকরণ করতে প্রবৃত্ত; ইংলন্ডের রাষ্ট্রনীতিপ্রবীণেরা কী অবজ্ঞাপূর্ণ ঔদ্ধত্যের সঙ্গে সেই দস্যুবৃত্তিকে তুচ্ছ বলে গণ্য করেছিল। পরে একসময়ে স্পেনের প্রজাতন্ত্র-গভর্ন্‌মেন্টের তলায় ইংলন্ড কিরকম কৌশলে ছিদ্র করে দিলে, তাও দেখলাম এই দূর থেকে।’

পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি তার মোহভঙ্গ এবং পরবর্তী সময়ে তাদের উপনিবেশিক মনোভাবের প্রতি ঘৃণা, নিন্দা, অবজ্ঞা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই তার বিভিন্ন লেখনীতে। আর এরই মূর্তরূপ দেখি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর তার নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েও।

কথিত সভ্য মানুষগুলো যেখানে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে বোমা মেরে দেশ-জনপদ ধ্বংস করে দিচ্ছে; জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে; পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের মানুষদের নানাভাবে বঞ্চিত করছে-এই অত্যাচারিত বঞ্চিত গোষ্ঠী যখন এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-সংগ্রাম গড়ে তুলেছে তখন তারাই হয়ে গেছে সন্ত্রাসী। আসলে যখন ভিকটিমরা আর ভিকটিম হতে চায় না, তখন তাদেরকেই বলা হয় সন্ত্রাসী। তাই কবির সুমন বলেন,

                              

তুমি বন-বাদাড়ের লোক

শাল বনের দস্যি ছেলে

বড়ো একরোখা দুটি চোখ

তাই বন্দুক খুঁজে পেলে

মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিনিরা, ভারতে মাওবাদীরা আজ সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু কেনো তারা এ-পথ বেছে নিলো তা আমরা কখনও ভাবিনি। আজ গণবিধ্বংসী অস্ত্রের নামে এক দেশ অন্য দেশকে আক্রমণ করছে, আদিম বর্বর মানুষও তাই করতো কেবলই তাদের প্রথা বা আচার পালনের তাগিদে। আজকের মতো কোনো হীনস্বার্থ উদ্ধারে নয়। তাহলে সেই আমরা তাদের (আদিম) কীভাবে বর্বর বা অসভ্য বলি? সভ্য মানুষরা তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করছে, মানুষকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে রাখছে, ধর্ষণের শতক উদ্‌যাপন করছে, মিন্টু পেয়াদারের মতো অনেকেই বড়োলোক হওয়ার আশায় গৃহকর্ত্রীকে হত্যা করছে। তাহলে এটাই কি সভ্যতা? কথিত আধুনিক সভ্যতার দাবিদার মানুষগুলো আজ মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। আবারও রবীন্দ্রনাথে ফিরে যেতে হয়, ‘মানুষের ক্ষরিত রক্তের শক্তিপূজার মহাযজ্ঞে আদিম মানুষের মধ্যে এটি থাকা স্বাভাবিক, ...কিন্তু একই বিষয় যদি সংস্কৃতিবান মানুষের মধ্যে দেখা যায় সেটি পাশব প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো জরাগ্রস্ততার পুনরারম্ভই প্রমাণ করে।’ সভ্যসমাজে এসব ঘটনা ঘটার মূলে রয়েছে বৈষম্য। কিন্তু এটাই তো আধুনিক সভ্যতার চাবিকাঠি। আগন্তুক-এ মনমোহন বাবুও একই কথা বলেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র নিউইয়র্ক, রঞ্জনরা (সুধীন্দ্র বোসের বন্ধু) যাকে জাঁদরেলদের শহর বলে মনে করে, সেই নিউইয়র্কের কথাই বলেছেন মনমোহন। উন্মোচন করে দিয়েছেন ‘সভ্য নিউইয়র্ক’ এর আসল চেহারা। তার ভাষায়, ‘‘ফ্যামিলির পর ফ্যামিলি বসে আছে ব্যাজার মুখ নিয়ে; সামনে প্ল্যাকার্ড, we are homeless ।’ তাহলে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার যে-চিরাচরিত ধারণা তাকে আদৌ কি সভ্যতা বলা চলে?  

 

নগর সভ্যতার চিরাচরিত ধারণা, আসলেই কি সভ্যতা

সমাজের বিবর্তনের একপর্যায়ে গড়ে উঠেছিলো নগর। সামন্ত সমাজের ভূমিশ্রমিকরা সামন্তপ্রভুদের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো মুক্তির আশায় সেই নগরের কাছে। গিল্টবাসী সেই বণিকরা তাদের গ্রহণ করেছিলো সাদরে, স্বপ্ন দেখিয়েছিলো সুন্দর আগামীর। এরপর শ্রমিকরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গড়ে তুললো নগরসভ্যতা। আধুনিক সভ্যতা মূলত গড়ে উঠেছিলো নদীর তীরবর্তী এলাকায় যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সমতল এলাকায়। গড়ে ওঠে গগণচুম্বি অট্টালিকা। শিল্প, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই বয়ে নিয়ে আসে প্রভূত সাফল্য। আর এগুলোই তাদের কাছে হয়ে যায় সভ্যতার নিদর্শন। মানুষ তখন শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা আর যন্ত্রের মাঝেই খুঁজতে লাগলো ‘‘সভ্যতা’। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে গেলো, হলো অণু-পরিবার। সত্যজিৎ রায় এই চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন তার শাখাপ্রশাখা চলচ্চিত্রে। সেই চিত্র পারস্পারিক বিচ্ছিন্নতার। বাবার থেকে ছেলেরা যতোটা বিচ্ছিন্ন, পরস্পরের থেকেও ঠিক ততোটাই বিচ্ছিন্ন। এমনকি এই বিচ্ছিন্নতা রয়েছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও। এভাবে মানুষ ক্রমেই হয়ে থাকে আত্মকেন্দ্রিক। আস্থাগুলো কেমন যেনো আস্থাহীনতার সঙ্কটে পড়ে। নিরাপত্তার জন্য ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, কলাপসিবল গেইট আরও কতো কী! কিন্তু হারিয়ে গেলো কেবল প্রতিবেশি। তারপরও নিরাপত্তা এলো না, হারিয়ে যেতে লাগলো হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, জীবনবোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘সভ্যশাসনের চালনায় ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয়; সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ...।’

তথাকথিত নাগরিক সভ্য মানুষগুলোর কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তাদের স্বার্থই মূল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। এরই রূপায়ণ সত্যজিৎ করলেন আগন্তুক-এ। মনমোহন বাবু তার ভাগ্নি অনীলাকে চিঠিতে বাঙালির আতিথেয়তার ট্র্যাডিশনের কথা লেখেন। কারণ ঐতিহ্য সাক্ষ্য দেয়, অতীতে অচেনা অতিথিরাও গেরস্থের আতিথেয়তা থেকে বঞ্চিত হতো না। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি যে দীর্ঘ ৩৫ বছরে মানুষ আরও সভ্য হয়েছে (!)। এখন তাদের আতিথেয়তার ধরন বদলে গেছে। তাইতো অনীলা ও সুধীন্দ্র, মামা মনমোহন বাবুকে নিয়ে সঙ্কটে পড়ে যায়। এবং তিনি সৎ না অসৎ, তার আগমনের উদ্দেশ্য কী-ইত্যাদি প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে থাকে মামাকে।        

তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার মানুষগুলো আজ অতিথির আগমনে বাসার দামী জিনিসগুলো লুকিয়ে রাখে; অতিথি মামাকে সন্দেহ করে চোর বলে। সত্যজিৎ তার চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র মনমোহনকে দিয়ে তথাকথিত আধুনিক সভ্যতাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। রঞ্জনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কলকাতাকে সভ্য শহর (!) বলে অভিহিত করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘রাস্তায় এতো লোকজন, যানবাহন, চতুর্দিকে মূর্তিমান দম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে হাইরাইজগুলো। আর ৩৫ বছর পরে এখানে ফিরে এসেও দেখছি মানুষ টানছে রিক্‌শা। কন্ট্রাডিকশন না হলে আর সভ্যতা।’ সত্যজিৎ রায় এখানে রীতিমতো প্রতিষ্ঠানকে বিব্রত করেছেন মনমোহন বাবুর কথার মাধ্যমে। কিন্তু তিনি কেনো জানি প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করলেন না। আগন্তুক-এ যে-বিতর্ক তার গভীরতা অনেক বেশি। এর আদৌ কোনো সমাধান আছে কি না তা বলা বেশ কঠিন। কথিত ‘‘আধুনিক সভ্যতা এবং প্রযুক্তির আকাশ-ছোঁয়া উন্নতির পিছনেই অমানবিক দারিদ্র্য-শোষণ-পাপাচার। তুলনায় আদিম জাতিগুলির জীবনাচার ও জীবনাদর্শ কি সত্যিই নিন্দনীয় কদর্য বর্বরতা?’১০ না, তাদেরও নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ছিলো এবং এখনও আছে। বিশ হাজার বছর আগে আঁকা আলতামিরার বাইসন থেকেই প্রমাণ হয়, কথিত আধুনিক নর-নারীর তুলনায় আদিম মানুষের জীবনসংবেদ ব্যাপক ও গভীর ছিলো। তাই তাদেরকে বর্বর এবং অসভ্য বলার অধিকার আমাদের আছে কি?

সত্যজিৎ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আগন্তুক-এ। তিনি তার প্রায় সব চলচ্চিত্রেই বাস্তব সত্যের অনুসন্ধান করেছেন। তার সব চলচ্চিত্রেরই পরিণতি অন্তর্দৃষ্টি, সহনশীলতা আর ভালোবাসা। আগন্তুক-এর ক্ষেত্রে এ-কথা আরও বেশি খাটে। সত্যজিৎ তার নায়ক মনমোহনকে চারপাশের বিশ্বের সন্ধানের জন্য বিশেষ চোখ দিয়েছিলেন, দিয়েছিলেন বোধশক্তি। সাদামাটা চোখে হয়তো বিষয়গুলো ধরা পড়ে না। তাই আমরা দেখি নায়ক মনমোহন বাবু আদিবাসী আর প্রাচীন সভ্যতাকে যে-দৃষ্টিতে দেখেছেন তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার দাবিদার মানুষ বিষয়গুলো সেভাবে দেখতে পারেনি। তাই মনমোহন বাবু ওইসব প্রাচীন সভ্যতার মাঝেও সায়েন্স ও টেকনোলজির সন্ধান পেয়েছিলেন। তার এই বোধ বা দৃষ্টি এসেছিলো নিজের সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র সংস্কৃতির মানুষকে, বিশেষ করে শিশু বা আদিবাসীদের মতো সহজ-সরল মানুষকে দেখার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে। আর এ-জন্য তিনি তার জীবনের অর্ধেকটা সময় বনে-জঙ্গলে কাটিয়ে দিয়েছিলেন, যা অনীলা ও সুধীন্দ্র ভাবতেও পারেনি। তবে সত্যজিৎ এই অভিজ্ঞতার জন্য সবাইকে বনজঙ্গলে বা গ্রামে গিয়ে থাকতে হবে, এমন কথা বলতে চাননি। আগন্তুক-এ তিনি বললেন গাঁস্ত রোবের্জ-এর ভাষায়, ‘‘আমাদের চাই কিছুটা wanderlust (ভ্রমণপিপাসা), কিছুটা depaysement (বাস্তুছাড়া ভাব), নিজের মনোজগতের বাইরে আসা, দিকভ্রান্তি, কৃত্রিম নোঙর থেকে মুক্তি।’১১

 

কিছুই পড়ে না পাতে                

তাই বন্দুক নিলে হাতে

‘‘সেদিন ভারতবর্ষের জনসাধারণের যে নিদারুণ দারিদ্র্য আমার সম্মুখে উদ্‌ঘাটিত হল তা হৃদয়বিদারক। অন্ন বস্ত্র পানীয় শিক্ষা আরোগ্য প্রভৃতি মানুষের শরীরমনের পক্ষে যা-কিছু অত্যাবশ্যক তার এমন নিরতিশয় অভাববোধ হয় পৃথিবীর আধুনিক শাসনচালিত কোন দেশেই ঘটেনি। অথচ এই দেশ ইংরেজকে দীর্ঘকাল ধরে তার ঐশ্বর্য যুগিয়ে এসেছে।’১২ রবীঠাকুর ঠিকই বলেছিলেন। আজ এতো বছর পরে এসে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে একই ঘটনা ঘটছে। হো, ওঁরাও, সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা ও গন্ডিরা বিভিন্ন সময়ে বৃটিশ, জমিদার এবং মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলো। আজ  ওইসব আদিবাসীদের অবদানের কথা ভুলে গিয়ে তাদের অসভ্য বলা হচ্ছে। মনমোহন বাবু তাই অনীলা ও সুধীন্দ্রকে আদিবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এভাবে, ‘‘ভারতবর্ষের প্রাচীন অধিবাসী হচ্ছে কোল উপজাতি। সাঁওতালরা ওদেরই সমগোত্রীয়। আজ থেকে দেড়শ বছর আগে ওরা বৃটিশদের বিরূদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।’

সেই সময়ে উপনিবেশিক শক্তি তাদের দালালদের সঙ্গে নিয়ে আদিবাসীদের বিদ্রোহ অত্যন্ত নির্মমভাবে দমন করে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে, নির্যাতন করে, ধর্ষণ করে আদিবাসী নারীদের। কিন্তু কখনই তাদেরকে পরাজিত করা যায়নি। অথচ আজ  স্বাধীন ভারতে সেই আদিবাসীরা আগের মতোই অবহেলিত, শোষিত ও নির্যাতিত। ভারতের ছত্রিশগড়, বিহার, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। এরা যে শুধু ভারত সরকারের উৎখাত চায় তা নয়, বরং ভারত রাষ্ট্রের কাঠামোর পরিবর্তনের কথা বলে। ভারত সরকারও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষার নামে এদের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়োজিত করে ‘অপারেশন গ্রিন হান্টে’র অধীনে। কিন্তু কেনো তারা আজ  ভারত রাষ্ট্রের উৎখাত চায়? কী তাদের ক্ষোভ? কেনো শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, সে প্রশ্ন কেউ তোলে না। কিন্তু তার উত্তর পাওয়া যায় কবির সুমনের কাছে-

কিছুই পড়ে না পাতে

তাই বন্দুক নিলে হাতে

শালবনের দস্যি ছেলে

এতো সাহস কোথায় পেলে?

এই সাহসের খোঁজ করেছেন লেখিকা, মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। তিনি গভীর জঙ্গলে গিয়ে মাওবাদীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, ক্যাম্পে থাকেন, তাদের কথা শোনেন। কীভাবে ‘‘সভ্য রাষ্ট্রযন্ত্র’ উন্নয়নের নামে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে তাদের শোষণ করছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে, হত্যা-লুণ্ঠন এবং নারীদের ধর্ষণ করছে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ তার বয়ান নেন।

১৯৫০ সালে সংসদে ভারতের সংবিধান অনুমোদিত হয়, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি। সংবিধানে উপনিবেশবাদের নীতি অন্তর্ভূক্ত করা হয়, আদিবাসীদের আবাসভূমির দায়িত্ব অর্পণ করা হয় রাষ্ট্রের হাতে। ফলে এক রাতের মাথায় সমস্ত আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের নিজভূমিতে পরবাসী বা অবৈধ নাগরিক হয়ে যায়। বনের ওপর তাদের যে-অধিকার ছিলো তা থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়। এ-নীতি তাদের সমগ্র জীবন ব্যবস্থাকে বিষিয়ে তোলে। শুধু ভোটাধিকারের বিনিময়ে তাদের জীবন-জীবিকার উপায় এবং মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে মাওবাদীরা নির্বাচনকে একটি প্রতারণা এবং সংসদকে শুয়োরের খোঁয়াড় হিসেবে অভিহিত করে। স্বাধীনতার পর থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে আসছে। কবির সুমন আবার বলেন,

সাতচল্লিশ সাল থেকে

শুধু খিদেই দেখলে চেখে

কার অন্ন কাদের খাওয়া

বোকা ছেলের কান্না পাওয়া।

শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর সবখানে চলছে এ-রকম অন্যায়। সাদারা কালোদের ওপর, সংখ্যাগুরুরা সংখ্যালঘুদের ওপর, ধনীরা গরিবের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে অন্যায় সিদ্ধান্ত। বন্দুকের নল দেখিয়ে তাদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে, হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। আর যখনই তারা এর প্রতিবাদ করেছে তখনই চিহ্নিত হয়েছে বর্বর, অসভ্য, দস্যু বা সন্ত্রাসী হিসেবে। তার মানে বিশেষ কিছু নয়, ক্ষমতা নির্ধারণ করছে ‘‘সভ্যতা’ কী।

 

সভ্যদের কাছে যেখানে কাগুজে পরিচয়ই মুখ্য

কথিত অসভ্যদের কাছে মূল পরিচয় মানুষ

শিকড়ের টানে নিজ দেশের নিজ মানুষের কাছে ফিরে আসার তাগিদেই মনমোহন বাবু দীর্ঘ ৩৫ বছর পর একমাত্র ভাগ্নির কাছে ফিরে আসেন। কিন্তু ভাগ্নি অনীলা ও জামাই সুধীন্দ্র সহজভাবে মনমোহন বাবুকে গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের প্রশ্ন চেনা নেই জানা নেই, হঠাৎ একটা মানুষকে কীভাবে মামা বলে গ্রহণ করা যায়? মনমোহন বাবু এটা জানতেন যে ৩৫ বছর পর অচেনা কাউকে মামা বলে গ্রহণ করাটা স্বাভাবিক হবে না। তিনি এর জন্য কিছুটা সময় চেয়েছিলেন। কারণ মনমোহন বাবু কথিত সভ্যসমাজে যে-ট্র্যাডিশন চালু হয়েছিলো তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাই তিনি প্রশ্ন তোলেন, আসল-নকল যাচাইয়ের জন্য, আইডেন্টিটি জানার জন্য নামের সঙ্গে নাম, ছবির সঙ্গে ছবি মিলিয়ে নেওয়াই কি যথেষ্ট? তার ভাষায়, মানুষকে চেনার জন্য, জানার জন্য কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। কারও সঙ্গে না মিশলে, আসলে তার সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। কিন্তু কথিত সভ্যরা মনমোহন বাবুর সঙ্গে মিশতে এবং তাকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। সভ্য সমাজের কাছে কাগুজে পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠেছিলো। তাই চাওয়ার আগেই মনমোহন তার পাসপোর্টটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন সুধীন্দ্রের দিকে।

যদিও মনমোহনের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছিলো কথিত ‘অসভ্য’ আদিবাসীদের সঙ্গেই, তারপরও তিনি ভালোই খোঁজ-খবর রাখতেন ‘‘সভ্য বিশ্বের’। তাই তিনি সুধীন্দ্রকে আক্ষেপ করে বলেন, This pasport proves nothing. কারণ সভ্য সমাজ আজ  এরও নকল করতে দক্ষ হয়ে গেছে। মনমোহন বাবুর এ-কথা সুধীন্দ্রকে আরও চিন্তায় ফেলে দেয়। সুধীন্দ্র তাই মনমোহন বাবুকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করতে থাকেন। সত্যজিৎ রায় এখানে অধুনা বিশ্বের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। এর আগে শাখাপ্রশাখাতেও তিনি এই দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দেখান, মানুষ দুর্নীতি করছে কিন্তু সেটাকে অন্যায় মনে করছে না। নৈতিকতার এমন চরম স্খলনের পরও তারা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করছে।

আজকের সভ্য বিশ্ব সব কাজেই কাগুজে পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের জটিল জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবখানেই দরকার হয় এই কাগুজে পরিচয়ের। তারা নিরাপত্তার দোহাই দেয়। তাদের এই চিন্তা-চেতনা একদিনে গড়ে ওঠেনি। ভারতবর্ষের মানুষ দীর্ঘদিন উপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিলো। উপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী তাদের শাসন-শোষণ দীর্ঘায়িত করতে চালু করেছিলো নানান নিয়ম-কানুন। আজ আমরা তাদের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হলেও তারা আমাদের সভ্য করার নামে যে নিয়ম-কানুন শিখিয়েছিলো তা থেকে বের হতে পারিনি। তাই আজ আমাদের কাছে রক্তের পরিচয়ের চেয়ে কাগুজে পরিচয়ই মুখ্য হয়ে গেছে।      

কারণ মানুষকে যদি কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যদি তাদের সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য প্রশাসনের কাছে নথিবদ্ধ থাকে তাহলে সহজেই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করা যায়। ফুকো একে ‘গভার্নমেন্টালিটি’ বা ‘প্রশাসনিকতা’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘এই কায়দায় ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান অবলম্বন হল জনগোষ্ঠী সমন্ধে প্রশাসনিক জ্ঞান। বস্তুত ‘স্ট্যাটিসটিকস’ কথাটার আক্ষরিক অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান। ফুকো দেখাচ্ছেন, আধুনিক সমাজে যতই প্রশাসনিকতা বিস্তৃত হয়েছে, ততোই গড়ে উঠেছে জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে শ্রেণীবদ্ধ করে তাদের সমন্ধে সরকারি তথ্য সংগ্রহ। বলা বাহুল্য, আধুনিক আদমশুমারি বা সেন্সাস এর একটা প্রধান উদাহরণ, কিন্তু সেটা আধুনিক প্রশাসনিক জ্ঞানের অতি সামান্য একটা অংশ। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি দৈনন্দিন কাজকর্ম-তা সামাজিক হোক অথবা ব্যক্তিগত হোক, সরকারি হোক অথবা পারিবারিক হোক, শারীরিক হোক আর মানসিক হোক-সবই কোনও না কোনওভাবে হাসপাতাল, স্কুল, পুরসভা, খাদ্যদপ্তর, অর্থদপ্তর, আদালত, পোস্টঅফিস, থানা, ব্যাঙ্ক এবং আরও সাম্প্রতিককালে সমাজ গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা মার্কেট রিসার্চ সমীক্ষায় নথিবদ্ধ হয়ে এই বিশাল প্রশাসনিক জ্ঞানভান্ডারের অঙ্গীভূত হয়ে যাচ্ছে।’১৩ এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হচ্ছে সমাজ নীতি, পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্র। আজ আমরা দেখি রাষ্ট্র জন্ম-নিবন্ধন, বিবাহ-নিবন্ধন, ভোটার-নিবন্ধন, মৃত্যু-নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভিসা আরও কতো রঙে কতো ঢঙে মানুষকে পকেটবন্দি করে রেখেছে। আর এ-জন্য রাষ্ট্র ব্যবহার করছে স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, কারাগারকে। কিন্তু রাষ্ট্র আমাদেরকে বলছে যে তারা এটা করছে আমাদের কল্যাণের জন্য। শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রই যে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কার্যকর করছে বিষয়টি এমন নয়, এর বাইরেও আছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, যারা এই ব্যাপক প্রশাসনিকতার অংশ। 

কিন্তু এতো কিছুর পরও তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারে না। কারণ, মানুষ আজ তাদের নৈতিক অবস্থান থেকে সরে গেছে। আর তাদের মনুষ্যত্ব লোপ পেয়েছে। মনমোহন বাবু কিছু প্রশ্ন তুলে আমাদের মনুষ্যত্বকে নাড়া দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মনমোহন বাবুর কথায় যুক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও তথাকথিকত সভ্য বিশ্ব একে মানেনি। তারা পাল্টা যুক্তি দিয়েছে। তাই মনমোহন বাবু তাদের ট্র্যাডিশন বদলাতে পারেননি বা চেষ্টাও করেননি। তিনি শুধু চেয়েছেন তাদের মনুষ্যত্ববোধ জাগাতে; বলেছিলেন শুধু মনকে আকাশের দিকে খোলা রাখতে। তার নিজের ক্ষেত্রে আকাশমুখী পথটি গিয়েছিলো নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীদের মধ্য দিয়ে। তিনি ৩৫ বছর আগে ঘর ছেড়েছিলেন বিশ হাজার বছর আগে আঁকা আলতামিরার দুরন্ত বাইসনের ছবি দেখে। তার মতে, এই বাইসন আছে সবার মাঝে। তবে সবার মধ্যে সমান শক্তি নিয়ে নেই, অনেকের মধ্যে আছে সুপ্ত অবস্থায়। মনমোহন বাবু সেই বাইসনকে ঘুমিয়ে পড়তে দিতে নিষেধ করেছেন। অন্তত বাইসনের শিং দুটো যেন একটু নড়াচড়া করে।

কবিগুরুও মানুষের কাগুজে পরিচয়ের চেয়ে আত্মার পরিচয়কে বা সমন্ধেকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের যে-সম্পর্ক তাকেই সবচেয়ে মূল্যবান ও যথার্থ সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষায়, ‘মানুষে মানুষে যে-সম্বন্ধ সবচেয়ে মূল্যবান এবং যাকে যথার্থ সভ্যতা বলা যেতে পারে তার কৃপণতা এই ভারতীয়দের উন্নতির পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে দিয়েছে।’১৪

চলচ্চিত্রটির শেষ পর্যায়ে দেখা যায়, মনমোহন বাবুর রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়রা যেখানে তাকে মামা বলে গ্রহণ করতে পারেনি, সেখানে অপরিচিত সাঁওতাল পল্লীতে তার ঠাঁই হয়েছে। সেখানে তারা মামাকে সাদরে গ্রহণ করেছে, সর্র্বস্ব দিয়ে আতিথেয়তার দায়িত্ব পালন করছে। কারণ তাদের কাছে কাগুজে সম্পর্কের চেয়ে বড়োকিছু হলো ‘মানুষ পরিচয়’। আমরা যাদের অসভ্য বলি, তারা কিন্তু কথিত সভ্যদের মতো এমন জটিলভাবে এই সম্পর্ককে দেখেনি।

 

আগন্তুকের সর্বস্ব দান : শেষ কর্তব্য পালন

নাকি আতিথেয়তার প্রতিদান!

মনমোহন বাবু ভ্রমণের নেশায় বিএ পাশ করে ঘর ছাড়েন। সভ্য আর অসভ্য জিনিসটা আসলে কী তা নিয়ে তার ছিলো অদম্য কৌতূহল। ৩৫ বছর পর হঠাৎ তার চিঠি। একমাত্র নিকট আত্মীয় ভাগ্নির বাসায় আসতে চান। একটা ছোট খবরকে ঘিরে অনীলা আর তার স্বামীর কথাবার্তা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাহিনী এগোতে থাকে। একসময় চিঠির সেই লোকটি কলকাতায় চলে আসেন। কিন্তু অতিথির বাড়িতে কিছু মিষ্টান্ন বা উপহার নিয়ে যাওয়ার বাঙালির যে চিরন্তন প্রথা তিনি তা করলেন না। এজন্য সুধীন্দ্র অবশ্য তাকে হাতভারি লোক বলে মন্তব্য করতে ছাড়েননি। তার ভাষায়, ‘৩৫ বছর পরে আপন ভাগ্নিকে দেখতে যে লোক খালি হাতে আসতে পারে, সে আর যাই হোক মুক্ত হস্ত নয়।’

সত্যজিৎ এখানে বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন। এই একটি জায়গায় আমরা সত্যজিতের সঙ্গে একমত হতে পারিনি। তিনি মনমোহন বাবুকে দিয়ে খাবার আনাতে পারতেন। এতে নাগরিক সভ্য মানুষগুলোর মুখোশ আরও ভালোভাবে উন্মোচন করার সুযোগ ছিলো। কেননা তিনি খাবার আনলেও এই নাগরিক সভ্য মানুষগুলো হয়তো তা ছুঁয়েও দেখতো না এই ভেবে যে, যদি খাবারে চেতনানাশক বা বিষ মেশানো থাকে! যেখানে তারা ওই মানুষটিকে বিশ্বাসই করতে পারছে না, সেখানে তার আনা খাবার গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না। যাহোক সত্যজিতের চলচ্চিত্রের সমালোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। এখন মূল আলোচনায় ফিরে যাই।

দীর্ঘদিন বাইরে থাকার পরও মনমোহন যে খুব একটা পয়সা-কড়ি জমাতে পেরেছিলেন এমন নয়। কারণ তার পয়সা জমানোর অভ্যাস (তার ভাষায় মুদ্রাদোষ) ছিলো না। সহজ-সরল মনমোহনের এ-নিয়ে অবশ্য খুব বেশি খেদ ছিলো না। কারণ তার কাছে ছিলো মানুষের জন্য অপার ভালোবাসা। তাই মনমোহন বাবু সহজেই ভাগ্নির পরিবারকে আপন করে নিয়েছিলেন। অনীলাও মামাকে দেখে প্রথমেই প্রভাবিত হন। সুধীন্দ্রর ছেলেতো প্রথম থেকেই মনমোহন বাবুকে দাদু বলে সম্বোধন করছিলো; কারণ তার সহজ-সরল মন তখনও কথিত সভ্য সমাজের গোলক ধাঁধায় পড়েনি। অনীলা তার নারীসুলভ মন দিয়ে মামার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন। কিন্তু তিনি কথিত সভ্যসমাজের বেড়াজাল থেকে বের হতে পারেনি। আর সুধীন্দ্র বোস তো প্রথমে তাকে চোর বলে সাব্যস্ত করে। তাই তারা দামী জিনিসগুলো সরিয়ে রাখে, বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধবদের দিয়ে বারবার পরীক্ষা করে নিতে চায় তিনি আসল না নকল মামা। তার আগমনের উদ্দেশ্যই বা কী; খোঁজ করতে থাকেন তার সম্পত্তির হিসাবের।

পৃথ্বীশ অপমান করার পর ক্ষোভে-দুঃখে ঘর ছেড়ে চলে যান মনমোহন বাবু। এরপর তিনি যখন শান্তিনিকেতনে শেতল বাবুর কাছে যান তখন প্রথমেই পাসপোর্ট দেখিয়ে বলেন, তিনিই আসল মনমোহন। শেতল বাবুর কাছে তার বেশকিছু অর্থ সংরক্ষিত ছিলো। ততোদিনে সুদে-আসলে সেই টাকার অংকটা অনেক বেড়ে যায়। মনমোহন সেই টাকার হিসাব বুঝে নেন, তবে নিজের জন্য নয়।

যে-সভ্যসমাজ মনমোহন বাবুকে অপমান করে, যারা তাকে চোর বলে সন্দেহ করে, বারবার বন্ধুদের দিয়ে যাচাই করে, সত্যজিৎ তার নায়ক মনমোহনকে দিয়ে সেই সমাজকে চপেটাঘাত করেন। এটা ছিলো তাদের আচরণের জবাব। যাবার আগে তিনি সুধীন্দ্রের হাতে একটি চিরকুট দিয়ে যান। যেখানে তাদের আতিথেয়তার উদ্দেশ্যে অল্প কথায় অনেক বড়ো বার্তা ছিলো-

বুঝে দেখ রক্তের টান

সুভাগিনী ভাগিনিরে

মামা তার ভাগ দিয়ে যান

এর মধ্য দিয়ে সবকিছু মিলিয়ে অচেনা এই no one, সুধীন্দ্র ও অনীলার কাছে হয়ে ওঠেন some one। মানুষে মানুষে সম্পর্ককে স্বার্থগত দেখার যে নাগরিক প্রবণতা, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন ‘‘কৃপণতা’ তা থেকে বেরিয়ে মনমোহন হয়তো তথাকথিত সভ্যদের কাছে হয়ে উঠলেন ‘‘অসভ্য’।

শেষকথা

বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের জন্য রবীন্দ্রনাথ যা করেছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য সত্যজিৎ তাই করে গেছেন। বহুদিক থেকেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতেন সত্যজিৎ। তাই আগন্তুক দেখে আমাদের মনে হয়েছে একে রবীন্দ্রনাথের সভ্যতার সংকট-এর প্রতিচ্ছবি বললে বোধ হয় ভুল হবে না। বাংলা চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায় যে-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন, দর্শকের কাছে বার্তা পাঠানোও তার একটি। তার চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র মনমোহন বাবুর মধ্যে তাড়া করে ফেরে বাইসনের উদ্দাম বল। আর ওই মনমোহনকে দিয়েই তিনি তথাকথিত আধুনিক সভ্যতাকে নানান প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এই সভ্যতার বিভিন্ন অসঙ্গতি। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছেন বৈষম্যই হচ্ছে এই সভ্যতার চালিকাশক্তি। দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সভ্য মানুষগুলো আজ রক্তের সম্পর্কের আত্নীয়কেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এই সমাজ মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি অস্ত্র নিক্ষেপ করে গোটা দেশ-জনপদ ধ্বংস করে দিতে পারে। একে কীভাবে আধুনিক সভ্যতা বলা চলে তাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানিক বাবু।

মানবতার কবি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টকে একটি চিঠি লিখে অ্যাটমবোমা বানানোর অনুরোধ করেছিলেন। তবে তিনি যে তা স্বপ্রণোদিতভাবে করেছিলেন ব্যাপারটা তেমন নয়। তার বন্ধু আইনস্টাইনের অনুরোধে তিনি এমনটা করেছিলেন। চিঠিতে তুলে ধরেছিলেন অ্যাটমবোমার প্রয়োজনীয়তার কথা। এরপর বোমা তৈরি হলো, যুদ্ধে ব্যবহারও হলো। ধ্বংস হয়ে গেলো জাপানের দুটি নগর হিরোশিমা এবং নাগাসাকি। সে-দিন অ্যাটমবোমার স্রষ্টা আইনস্টাইন অনেকটা আলফ্রেড নোবেলের মতোই অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তাই বৃদ্ধ আইনস্টাইন জাপানের ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‘আমি এক বৃদ্ধ মানুষ তোমাদের জন্য শুভ কামনা করছি এবং আশা করছি, একদিন তোমাদের প্রজন্ম আমাকে লজ্জায় ফেলবে।’১৫ মানবতার কবির সে-দিনের অনুভূতি জানা যায়নি। কারণ তিনি তখন মর্ত্যলোকের বাসিন্দা। তবে তিনি নিজের ভুল আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই কবিগুরুর কথা সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের রসদ জুগিয়েছে, প্রেরণা দিয়েছে গানওয়ালা সুমনকে।

লেখক : গোলাম কিবরিয়া জুয়েল হাসানুর কবির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

kibriamcj@yahoo.com

hassanur92@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৩); ‘সভ্যতার সংকট’; রবীন্দ্র রচনাবলী ত্রয়োদশ খণ্ড; পৌষ ১৪১০, ঐতিহ্য, ঢাকা।

২. ‘সভ্যতার সংকট’ মূলত ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের দেওয়া একটি বক্তৃতা

৩. পংক্তিগুলো কবীর সুমনের ‘‘বন্দুক নিলে হাতে’ শিরোনামের গানটি থেকে নেওয়া। ভারতের মাওবাদী নিয়ে লেখা আলোচিত এই গানটির বিভিন্ন পংক্তি এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।  

৪. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৬)।

৫. উদ্ধৃত, ‘নির্লজ্জ অমানুষতার বিরুদ্ধে’; ফারুক মঈনউদ্দীন; সমকাল এর শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়া, ৪ মে, ২০১২।  

৬. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৫)।

৭. ‘গাড়িচালক মিন্টু গ্রেপ্তার, হত্যার কথা স্বীকার; ১৯ এপ্রিল ২০১২, প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার গাড়িচালকের নাম মিন্টু পেয়াদা।

৮. উদ্ধৃত, ‘নির্লজ্জ অমানুষতার বিরুদ্ধে’; ফারুক মঈনউদ্দীন; সমকাল এর শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়া, ৪ মে, ২০১২।

৯. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৫)।

১০. গুপ্ত, ক্ষেত্র (২০০২ : ১৪৮); সত্যজিতের চিত্রনাট্য; সাহিত্য প্রকাশ, ৬০ জেমস লঙ সরণি, কলকাতা ৭০০০৩৪।

১১. রোবের্জ, গাস্তঁ (২০০৪ : ১২৭); ‘‘আগন্তুক : হৃদয়গুহা’; সংযোগ সিনেমা উন্নয়ন; বাণী শিল্প, কলকাতা।

১২. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৪)।

১৩. চট্টোপাধ্যায়, পার্থ (২০০০ : ৬২); ‘‘ক্ষমতা প্রসঙ্গে দুই প্রেক্ষিত : গ্রামশি ও মিশেল ফুকো’; ইতিহাসের উত্তরাধিকার; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

১৪. প্রাগুক্ত; ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ (২০০৪ : ৭৮৫-৮৬)।

১৫. উদ্ধৃত, ‘‘সুদূরের পিয়াসী’; মাহফুজ রাহমান; সমকাল এর শুক্রবারের সাময়িকী কালের খেয়া, ৪ মে, ২০১২।


বি. দ্র. এ প্রবন্ধটি ২০১৩ সালের জুলাইয়ের ম্যাজিক লণ্ঠনের তৃতীয় সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ করা হয়।


এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন