Magic Lanthon

               

মাহমুদুল হাসান পারভেজ

প্রকাশিত ০৪ অক্টোবর ২০২২ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

গাঙগর : গণমাধ্যমের খোঁজে গণমাধ্যম

মাহমুদুল হাসান পারভেজ


আমরা সবাই ‘বেশ্যা’! খটকা লাগলো বুঝি। লাগাটাই স্বাভাবিক। আধুনিক, সভ্যজাত সমাজের মানুষকে ‘বেশ্যা’ বলাটা দুঃসাধ্যও বটে। সাহস করেই বলছি, একটু খোলাসা করলে আমার সঙ্গে একমত হবেন বৈকি। যে মেয়ে অন্য উপায় না পেয়ে, শুধুমাত্র পেটের দায়ে শরীর বেচে, ভদ্র সমাজ তার নাম দিয়েছে বেশ্যা। যদিও শরীর বিক্রির পুরো টাকাটাও সে পায় না; ভাগ-বাটোয়ারা হয় দালাল-আমলা-পুলিশ আর জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে। কথায় ফিরে আসি, শরীর বিক্রি করলে যদি বেশ্যাবৃত্তি হয়, তব ‘সভ্য’ মানুষের তকমা এটে ‘নীতি-নৈতিকতা’ বিক্রি করলে কেনো ‘বেশ্যাবৃত্তি’ হবে না? ব্যাস, বুঝলেন তো কেনো আমরা সবাই ‘বেশ্যা’। আরও একটু খোলাসা করি। প্রতি মুহূর্তে আমরা নিজেদের বিক্রি করছি বা বিক্রি করার আপ্রাণ চেষ্টা করছি। চিকিৎসক তার সময় বিক্রি করছেন প্রাইভেট ক্লিনিকে; স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তার বিদ্যা-জ্ঞান বিক্রি করছেন; জনপ্রতিনিধি জনগণকে বিক্রি করছেন; বিচারক আইন বিক্রি করছেন; শ্রম বিক্রি করছেন শ্রমিক; সরকারি-বিরোধী দল ‘দেশ বিক্রি’ করছেন; আমলা বিক্রি করছেন ‘সুশাসন’, হুজুর-পুরোহিত ধর্ম, কবি-সাহিত্যিক লেখা, মডেল-নারী তার উরু-নাভী-পাছা-ঠোঁট। এছাড়া ইঞ্জিনিয়ার-ছাত্র-সাংবাদিক-সেনাবাহিনী-ব্যাংকার স্ব-স্ব জায়গায় নিজেকে বিক্রিতে ব্যস্ত।  তাই নিজেদেরকে ‘বেশ্যা’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।

তবে ‘বেশ্যাবৃত্তি’র সারিতে গণমাধ্যম প্রথম স্থানে, তা বলাই বাহুল্য। আবারও খটকা লাগতে পারে। লাগুক। যতো বেশি খটকা লাগবে, খোলাসা করা আমার জন্য ততো বেশি সহজ হবে। পাঠক ধৈর্য ধরুন, অস্থির হবেন না। গণমাধ্যমকে কেনো ‘বেশ্যা’ বলছি তার সদুত্তর পরে দেবো। তার আগে একটি সত্য ঘটনা সম্পর্কে জেনে নিই।

এই ছবিটা তুলেছিলেন ফটোগ্রাফার কেভিন কার্টার (Kevin Carter)। ১৯৯৪ সালে সুদানে জাতিসংঘের খাদ্য গুদামের কাছ থেকে ছবিটি তোলা। একটি শকুন অপেক্ষা করছে শিশুটির মৃত্যুর জন্য। কারণ, মৃত্যুর পর শিশুটির শরীরের মাংস খাবে। সারা দুনিয়াতে আলোড়ন তুলেছিলো ছবিটি। তবে শিশুটির শেষ পরিণতি কী হয়েছিলো, তা কেউ জানতে পারেনি। এমনকি কেভিন কার্টারও না। তবে ছবিটি পুলিৎজার পুরস্কার পায়। ফটোগ্রাফার কেভিন কার্টার এ-ঘটনার তিন মাস পর আত্মহত্যা করেন। পরে জানা যায়, ছবিটি তোলার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং এ-কারণেই হয়তো এই আত্মহত্যা। আত্মহত্যার আগে কেভিন কার্টার তার ডায়রিতে লিখে যান এ-রকম-

Dear God, I promise I will never waste my food no matter how bad it can taste and how full I may be. I pray that He will protect this little boy, guide and deliver him away from his misery. I pray that will be more sensitive towards the world around us and not be blinded by our own selfish nature and interests. I hope this picture will always serve as a reminder to us that how fortunate we are and that we must never ever take things for granted.

বুঝুন, বাজারের যুগে সাংবাদিকতা কতোটা মহৎ পেশা। শিশুকে বাঁচানো নয়, বরং স্পর্শকাতর অবস্থায় ছবি তোলাটা মহৎ পেশাদারিত্ব। আবার এমন ছবির জন্য পুরস্কৃতও হওয়া। প্রশ্ন আসতে পারে, এতোক্ষণ যা আলোচনা করলাম তা কি পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য? না, কোনো পাণ্ডিত্য জাহির নয়। আসলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে গণমাধ্যমের রূপ-চরিত্র বোঝার চেষ্টা করছি। যেখানে গণমাধ্যমকে বলা হচ্ছে ফোর্থ এস্টেট, ওয়াচডগ, জনগণের বন্ধু। কিন্তু পুঁজির সঙ্গে গণমাধ্যমের মিথোজীবী সম্পর্কের ব্যাকরণ মেনে এসব বিশেষণের প্রাপ্যতা কতোটুকু, তা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো মাত্র। বিশ্লেষণ করার জন্য নমুনা বা উদাহরণ হিসেবে বেছে নিয়েছি গাঙগর (GANGOR) নামের চলচ্চিত্রটি। ইতালির ইতালো স্পিনিলির (Italo Spinelli) পরিচালনায় এ-চলচ্চিত্রের কাহিনী গড়ে উঠেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার এক নারীকে কেন্দ্র করে। আসুন, এবার চলচ্চিত্রটির শানে-নুযুল দেখে নিই-

নারীদের মানবেতর জীবনযাপন ও ধর্ষণ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পুরুলিয়ার একটি গ্রামে যান দুই সাংবাদিক উপিন ও উলজান। উপিন ইটের ভাটায় কর্মরত নারীদের ছবি তোলার সময় দেখেন অদূরে এক নারী বসে আছেন; নাম গাঙগর। কাছে গিয়ে দেখা গেলো, গাঙগর তার শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছেন। উপিন, গাঙগরের স্তন দেখে আকৃষ্ট হয়ে ছবি তুলতে থাকেন। গাঙগর প্রথমে অসম্মতি জানান। এক পর্যায়ে উপিন টাকার বিনিময়ে এ-দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণে সফল হন। এদিকে গাঙগর কিন্তু জানে না, কী এমন বিষয় তার মধ্যে আছে, উপিনরা যা টাকা দিয়ে পর্যন্ত কিনলো! এরপর যা হওয়ার, তাই ঘটলো। সংবাদপত্রে যথারীতি ধর্ষণ বিষয়ক প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে গাঙগরের শিশুকে দুধ খাওয়ানো ছবি প্রকাশ হলো। তা দেখে শুরু হলো গাঙগরের প্রতি সমাজের ভর্ৎসনা এবং রুটি-রুজির জায়গা-Ñইটভাটা থেকে ছাঁটাই।

সমাজের এ-ভর্ৎসনা সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে স্বামী-সন্তান ফেলে গ্রাম থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন গাঙগর; পথিমধ্যে ঘটে আরেক ট্রাজেডি। এবার গণধর্ষণ-এর শিকার হন তিনি। তারপর জীবনের চাকা মোড় নেয় অন্যদিকে; জড়িয়ে পড়েন বেশ্যাবৃত্তিতে। ওদিকে উপিন অনুশোচনায় কলকাতা থেকে পুরুলিয়ায় ফিরে এসে গাঙগরকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। অনেক খোজাখুঁজির পর অবশেষে গাঙগরের সন্ধান পান; তাকে বেশ্যাবৃত্তি থেকে ফেরানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ততোদিনে গাঙগরের জীবনের অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। সমাজের নানান প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার তাড়া খেয়ে বিধ্বস্ত গাঙগর তখন সমাজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তার কাছে রাষ্ট্র, সমাজ, আইনের শাসন, গণতন্ত্র, গণমাধ্যম আর ধর্ষকরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

 

গণমানুষের হাতুড়ির কান্না : মুকেশ-আম্বানিদের মিনি স্বর্গ

বাজারি যুগে শোষণ আর বৈষম্য যেনো যমজ সন্তান। এর সফলতা দুটি জায়গায়-প্রথমত, একসঙ্গে মুষ্টিমেয় ব্যক্তিকে চরম আরাম-আভিজাত্যের মধ্যে রাখে। দ্বিতীয়ত, বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ন্যায্য অধিকারকে শোষণ ও বৈষম্যের জালে বাঁধে। এটা এখন কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ব্যাপার নয়, গোটা বিশ্বেরই সমস্ত সম্পদ আজ ওদের হাতে বন্দি। এইতো কিছুদিন আগে এর প্রমাণ মিললো খোদ আমেরিকায়, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনের মাধ্যমে। আন্দোলনকারীরা বললো ‘We are99%। অর্থাৎ ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ মাত্র এক শতাংশ মানুষের হাতে জিম্মি। এই ৯৯ শতাংশ মানুষের সম্পদ-শ্রমশক্তি শোষণ করে গড়ে তোলা হচ্ছে ঝকঝকে-তকতকে মহানগর। আকাশ ছোঁয়া বহুতল ভবন, বিলাসবহুল হোটেল-রেস্তোরাঁ, ফ্লাইওভার, শপিং মল। প্রাযুক্তিক ও অবকাঠামোগত এই উন্নয়ন দেখে মনে হতে পারে, জাতি-রাষ্ট্র উন্নয়নের চাদরে আবৃত!

কিন্তু বাস্তবতা কী? বাস্তবতা হচ্ছে, মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ আজ বাস্তুহারা। বিশ্ব-মন্দার ক্যানসারে রাষ্ট্র নামক শোষক যন্ত্রটি আজ জর্জরিত। পুঁজিবাদের ইঞ্জিন নামে খ্যাত আমেরিকাসহ ইউরো অঞ্চলে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। চলমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে মানুষের জীবনমান তলানিতে ঠেকেছে। বর্তমানে ঋণগ্রস্ত গ্রিসে ২০, স্পেনে ৩০ ও ইতালিতে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ বেকারত্বের শিকার। যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ায় ইউরো অঞ্চলে ১৭টি রাষ্ট্রের মধ্যে জার্মানি ছাড়া সব রাষ্ট্রে চলছে অস্থিরতা। ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO)এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে ক্ষুধার্ত বা ন্যূনতম পুষ্টিকর খাদ্য থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যা ৯২৫ মিলিয়ন বা ৯২ কোটি ৫ লাখ। যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার (৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন বা ৬ শত ৮০ কোটি) ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। গ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। মহাজনের ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। পুরো বিশ্বের আজ একই অবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও অভিন্ন চিত্র।

অথচ রাষ্ট্র কিন্তু এমন ভঙ্গুর অবস্থাতেও তার কর্তৃত্ব জাহির করতে ক্লান্ত হয়নি। গাঙগর-এ এর অনেকটা ছিটেফোঁটা আছে। এটির কাহিনী পুরুলিয়া শহরের অদূরেই এমন একটি গ্রাম নিয়ে, যেখানে তথাকথিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। গ্রামের বাড়িগুলো মাটির তৈরি, জীর্ণ; সেখানে নেই বিশাল অট্টালিকা, শপিংমল, প্রাডো-পাজেরো-লিমোজিনের বহর, বিপরীতে আছে কেবল ইটের ভাটা। ভাটার অধিকাংশই নারী শ্রমিক। প্রতিদিন তারা গরু-মহিষের মতো ট্রাকে আসা-যাওয়া করে। তাদের পরিশ্রমে তৈরি ইট থেকেই গড়ে ওঠে চোখ ধাঁধানো মহানগর। সেই মহানগরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকেন, ওই ভাটার মালিকরা। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, ভারতের ধনকুবেরদের দিকে তাকালে। ভারতের প্রথম চারজন ধনকুবেরের সম্পদের পরিমাণ (মার্চ ২০১২ হিসাবে) ৯ লাখ কোটি রুপি। প্রথম ১০ ধনীর সম্পদের পরিমাণ ১২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি রুপি।

এবার চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (এপ্রিল-জুন) দেশটির কয়েকজন পুঁজিপতির নিট মুনাফার পরিমাণ দেখে নেওয়া যাক। গোয়েস্কার বিদ্যুৎ কোম্পানি সিইএসসির তিন মাসে নিট মুনাফা হয়েছে ১২৫ কোটি রুপি (গত বছর এই তিন মাসে যার পরিমাণ ছিল ১১১ কোটি রুপি)। মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স কমিউনিকেশন এই তিন মাসে নিট মুনাফা করেছে ১৬২ কোটি রুপি (গত বছর একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ১৫৭ কোটি রুপি)। রতন টাটার টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস এর নিট মুনাফা ২ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৫৯ কোটি রুপি (গত বছর এই তিন মাসে যার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬২ দশমিক ৪৩ কোটি রুপি)।

অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ অর্জুন সেনগুপ্তের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রাইজেসেস ইন দ্য অর্গানাইজড সেক্টরবছর আগে দেখিয়েছেন, অসংগঠিত ক্ষেত্রে ৭৭ শতাংশ মানুষ শোচনীয় দারিদ্র্যের কবলে। এদের রোজগার দিনে ২০ রুপিরও কম এবং এদের মধ্যে একটা বড়ো অংশের রোজগার দিনে ৯ রুপির নিচে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও প্রকল্প রূপায়ণ দপ্তর ৬৮তম জাতীয় নমুনার রিপোর্টে প্রকাশ করেছে যে, ভারতের গ্রামগুলির ৫০ শতাংশ মানুষ দিনে ৩৫ রুপিরও কম খরচ করতে পারে। ১০ শতাংশ মানুষের দৈনিক খরচ করার ক্ষমতা ১৬ রুপি ৭৮ পয়সার বেশি নয়। এছাড়াও অপুষ্টিতে আক্রান্ত ৬৪ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৪ লাখ শিশু; যা সারা পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক।

ভারতে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ফোর্বস ম্যাগাজিনের রিপোর্ট অনুযায়ী ৬৯ ছাড়িয়ে গেছে। এর পাশাপাশি বিশ্বের সম্পদ নিয়ে ডেটামিনেটর সংস্থার করা ২০১২ সালের রিপোর্ট বলছে, সম্পদের বিচারে ইতোমধ্যেই বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে ভারত ষষ্ঠ অবস্থানে চলে আসবে। অথচ গত ১০ বছরে ভারতে প্রায় দুই লাখ কৃষক ঋণ শোধ করতে না পারায় আত্মহত্যা করেছে। অন্যদিকে, রতন টাটা কিংবা আম্বানিরা অর্থের সমুদ্রে নাবিক হয়ে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গাড়ি-বাড়ির প্রয়োজন অনুভব করছে। শুধুই কি গাড়ি-বাড়ি? প্রয়োজন হয়ে পড়ে স্বর্গ নামের অধরা কল্পনাকে মুঠোয় নেওয়ার। তাইতো আম্বানিরা অ্যান্টেলিয়া (Antilia) নামের মিনি স্বর্গ তৈরি করে স্ত্রীকে উপহার দেন। মাত্র ছয় সদস্যের জন্য খরচ করা হয় ১০০ কোটি ডলার। এ-বাড়িতে রয়েছে সুইমিং পুল, যোগ-ব্যায়ামের স্টুডিও, ঝুলন্ত বাগান, তিনটি হেলিপ্যাড, হেলথ ক্লাব আর ঘরে বসে তুষারপাতের স্বাদ নেওয়ার ব্যবস্থা। তবে এর কোনোকিছুই থামাতে পারেনি মুম্বাই বস্তির নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

এই হলো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শোষণের হাল-হকিকত। অথচ এই বাস্তুহারা-ক্ষুধার্ত-শোষিত মানুষগুলো যখন আপন অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করে, তখন এই রাষ্ট্রই তাদের ওপর চড়াও হয়। ১৬ আগস্ট ২০১২ নেলসন ম্যান্ডেলার দেশে শ্রমিকের ওপর ঘটে এক বীভৎস ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার রুস্টেনবার্গের ম্যারিকানার লোনামিন-প্লাটিনাম খনির শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে সমাবেশ ডাকে। সমাবেশে পুলিশ কাছ থেকে গুলি চালিয়ে ৩৬ শ্রমিককে হত্যা করে; আহত হয় ৮০ জন ও গ্রেফতার করা হয় শতাধিক শ্রমিককে।

মতাদর্শিক কারণে রাষ্ট্রের এসব শোষণকে জায়েজ করতে সবসময় অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে গণমাধ্যম। মানুষের প্রকৃত অবস্থার বিপরীতে এরা ভোগ-বিলাসের সংস্কৃতি গড়ে তোলাকেই একমাত্র এজেন্ডা মনে করে। কারণ, গণমাধ্যমের লাগাম রাষ্ট্রের পরিচালক পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে। ফলে বলিউড সুপারস্টার শাহরুখ খান বাংলাদেশে আসলে সংবাদের শিরোনাম হয়। অথচ তিস্তার পানি সঙ্কটে গরিব কৃষকের চাষাবাদ ব্যাহত হলেও তা গণমাধ্যমের নজরে আসে না। একইভাবে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের ভঙ্গুর জীবন ব্যবস্থার চেয়ে গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়, বছর শেষে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কতো বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে তা!


আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল হয় থানা-আদালত। সেখানেও পুরুষতন্ত্রের ভূত। নারীর মুখের কথায় নয়, শরীর দিয়ে প্রমাণ করতে হয় তিনি ধর্ষিত। সেই সুযোগে পুরুষ-পুলিশের জেরায় একবার, আর চিকিৎসকের কাছে উলঙ্গ হয়ে আরেকবার তাকে ধর্ষিত হতে হয়। এখানে শেষ হলে ভালো হতো। এবার বিচারের নামে চলে চরম নিষ্ঠুরতা। বিপক্ষের উকিল প্রাণপণে চেষ্টা করে নারীকে বহুগামী, চরিত্রহীন, পতিতা প্রমাণ করার, চলে অশালীন প্রশ্নের ঝড়। ধর্ষিতাকে বর্ণনা করতে হয় বীভৎসতার আখ্যান।

 

একজন গাঙগরের আর্তনাদ : আস্ফালনে পুরুষতন্ত্র

গাঙগর-এ শিশুকে দুধ খাওয়ানোর ছবি সংবাদপত্রে প্রকাশের পর গাঙগর সমাজের কাছে চোখের বালিতে পরিণত হয়। পরিস্থিতি এমন হয়, একদিন তিনি গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানেও নতুন সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। এবার আরেক মানুষ-এর হাতে ক্ষত-বিক্ষত হয় তার দেহ, মন ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন। চার যুবক মিলে গাঙগরকে ধর্ষণ করে, তার শেষ আশ্রয়স্থল হয় পতিতালয়। কিন্তু উপিন পুরুলিয়ায় ফিরে অনেক খুঁজে গাঙগরকে বের করেন। চেষ্টা করেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর। কিন্তু তাতে কাজ হয় না। উপিনকে এই জীবনের জন্য দায়ি করে গাঙগর তার ক্ষত-বিক্ষত শরীর উন্মুক্ত করে দেখাতে চায়। অনাবৃত বক্ষে গাঙগর বিলাপ করতে থাকে ওরে খ্যাপা কুকুরের মতো চাবা না। দল বেধে ধর্ষণ কর না। কথাগুলো চপেটাঘাত-এর মতো কানে লাগে উপিনের, পুরুষতান্ত্রিকতা নামক অমানবিক ব্যবস্থার। যে-ব্যবস্থা নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিটোল যৌনবস্তু-দাসী হিসেবে দেখতে বেশি আরামপ্রদ মনে করে। 

কিন্তু সমস্যা হলো গাঙগরের ন্যায় অসংখ্য গাঙগর রয়েছে সমাজে। ইয়াসমিন, রিতা, সখিনা, সুস্মিতা, পিংকি, সুমি, সীমা, জুঁই, রাণী, বৃষ্টি নামের গাঙগররা প্রতিদিন পুরুষতন্ত্রের কাছে পরাজিত হয়। বাহ্যিক চাকচিক্যে আমরা আধুনিক হই, মানসিকতায় অন্ধকারে ডুবতে থাকি। তাই আজও কোনো নারী বাইরে একা চলতে ভয় পায়, সম্মুখীন হয় পুরুষালি সহিংসতার। তাইতো বাস-ট্রেনে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো, শরীরে হাত দেওয়া, অশালীন মন্তব্য, শিস বাজানো, অবাচনিক লম্পট চাহনি, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, উড়ন্ত চুমুর ইঙ্গিত ইত্যাদি ঘটে নিত্যনৈমিত্তিক। এই পুরুষতন্ত্রের পাশবিকতার চূড়ান্ত রূপ হলো ধর্ষণ। নারী ধর্ষণ হলে প্রিন্ট-মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়, পারলে ধর্ষিতার নামসহ। ব্লগ, ফেইসবুক, টুইটারে স্ট্যাটাস-এর ঝড় ওঠে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরব হয় সভা, মিছিল, মানববন্ধনে। কিন্তু ধর্ষকের আর ন্যায্য বিচার হয় না। ক্ষমতা আর আইনের মারপ্যাঁচে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে যায় বেরিয়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মানিক ১০০টি ধর্ষণ করে ক্যাম্পাসে মিষ্টি খাইয়ে উৎসব করে। আর মেয়েগুলোর জন্য অপেক্ষা করে নির্মম কোনো পথ।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর ২০১২ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর, নয় মাসের রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৬৫১ জন নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ২৩৯ জন নারী, ৩৮৪ জন মেয়েশিশু এবং ২৮ জনের বয়স জানা যায়নি। ২৩৯ জন নারীর মধ্যে ২৬ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৮৬ জন শিকার হয়েছে গণধর্ষণের। ৩৮৪ জন মেয়েশিশুর মধ্যে ৩১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৬৭ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময়কালে ৯ জন শিশু আত্মহত্যাও করে।

আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষের বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল হয় থানা-আদালত। সেখানেও পুরুষতন্ত্রের ভূত। নারীর মুখের কথায় নয়, শরীর দিয়ে প্রমাণ করতে হয় তিনি ধর্ষিত। সেই সুযোগে পুরুষ-পুলিশের জেরায় একবার, আর চিকিৎসকের কাছে উলঙ্গ হয়ে আরেকবার তাকে ধর্ষিত হতে হয়। এখানে শেষ হলে ভালো হতো। এবার বিচারের নামে চলে চরম নিষ্ঠুরতা। বিপক্ষের উকিল প্রাণপণে চেষ্টা করে নারীকে বহুগামী, চরিত্রহীন, পতিতা প্রমাণ করার, চলে অশালীন প্রশ্নের ঝড়। ধর্ষিতাকে বর্ণনা করতে হয় বীভৎসতার আখ্যান। আবার কখনও রাষ্ট্র (পুলিশতো আসলে রাষ্ট্রই) স্বয়ং ভক্ষক হয়ে ওঠে গাঙগরদের। আমরা ভুলে যাই দিনাজপুরের ইয়াসমিনের কথা, রংপুরে গ্রাম্য সালিশে দুই নারীকে পিটিয়ে জখমের পর হাইকোর্টের নির্দেশে সার্বক্ষণিক পুলিশি নিরাপত্তায় থাকা অবস্থায় জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণের কথা। এসব এখন ভুরিভুরি।

ধরুন, গাঙগরের কথা। যদিও শেষ পর্যন্ত পুলিশ গাঙগরের ধর্ষকদের গ্রেফতার করে, আদালতে নেয়। একই সঙ্গে আদালত প্রাঙ্গণে ধর্ষণ বন্ধে স্লোগান চলে, স্তন উন্মুক্ত করে নারীরা এর বিচারের দাবি জানায়। তার মানে, রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর ওই নারীরা আস্থা পায় না, প্রকাশিত সত্যের বিচারের দোলাচল নিয়েও এরা চিন্তিত। এই কী তাহলে আধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র! চলচ্চিত্রের শেষে ক্লোজ-শটে আদালতের বারান্দায় দাঁড়ানো গাঙগরের চাহনিতে ছিলো ঘৃণা, ক্ষোভ আর লজ্জা। পরিচালক আদালতের শুনানি বা রায় পর্যন্ত না গিয়ে, এখানেই চলচ্চিত্রটি শেষ করে দেন। প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি গাঙগরদের এই ঘৃণা, ক্ষোভ আর লজ্জার কোনো শেষ নেই?

 

গণমাধ্যম, সমাজের নাকি পুঁজির দর্পণ

চরিত্রগত বিস্তর পার্থক্য না থাকলেও প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বর্তমান সাম্রাজ্যবাদের রূপগত পার্থক্যও রয়েছে। প্রাচীন সাম্রাজ্যবাদে এক রাষ্ট্র বা জাতি অন্য কোনো জাতি বা রাষ্ট্রে সরাসরি শাসন ও প্রভুত্ব কায়েম করতো। এদিক থেকে রোম, পারস্য, মিসরিয়, অসিরিয়, সুমেরিয়, চীন বেশ পরিচিত। এদের লক্ষ্য ছিলো আপন ক্ষমতা, শৌর্য-বীর্যের সর্বোচ্চ প্রদর্শন, অত্যাচার, প্রভুত্ব কায়েম আর সবিশেষ সম্পদ লুণ্ঠন। আধুনিক ইতিহাসে এ-পথে ইংরেজ, ফরাসি, স্পেনিয়, মার্কিনরা সমধিক আলোচিত। তারা কিন্তু আর আগের রূপে নেই। হাল আমলে এরা সাম্রাজ্য গেড়েছে মনোজগতে। যেটি অনানুষ্ঠানিক সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশহীন উপনিবেশবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ, নয়া সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি প্রপঞ্চরূপে প্রকাশিত।

এই নয়াকৌশলীরা নতুন কোনো সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্র দখল করার চেয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে। মূলত এরা ১৯৯০-এ সমাজতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক পতনের পর থেকে  আরও বেশি নগ্ন খেলায় মেতে ওঠে। মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে সুসংগঠিতভাবে বিদেশে বাজার দখল ও শ্রম শোষণের মাধ্যমে বিনিয়োগী পুঁজি সম্প্রসারণ করতে থাকে। এজন্য বিনির্মাণ করতে থাকে আপাত অচেনা এক ভোগবাদী বিশ্বের। ফলে সব দেশের সব সংস্কৃতিকে হটিয়ে গড়ে উঠতে থাকে একটি একক কর্পোরেট সংস্কৃতি।

একই সঙ্গে ভোগবাদী ও কর্পোরেট সংস্কৃতির আদর্শ ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ-বিনির্মাণ করা হয়। বর্তমানের গণমাধ্যম এমনই একটি বিনির্মিত সামাজিক প্রতিষ্ঠান। একে জনগণের বন্ধু-ফোর্থ এস্টেট-ওয়াচডগ নামে ডাকা হয়। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত রূপটি অতি ভয়ঙ্কর; যা অধিকাংশ মানুষেরই অজানা। পুঁজিবাদী-বাজারি দুনিয়ায় গণমাধ্যমের সামাজিক রূপটি হারিয়ে পরিণত হয়েছে মুনাফা-কর্পোরেট-ধনিকঅভিমুখি। এরই উপজাত হিসেবে গণমাধ্যম পুরুষ অভিমুখিও।

ফিরে যাই গাঙগর-এ। বলেছিলাম গাঙগরের শিশুসন্তানকে দুধ খাওয়ানোর ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের কথা। তারপর গাঙগরের কী হয়েছিলো, তা তো সবারই জানা। প্রশ্ন ওঠে, ফটোসাংবাদিক উপিন কেনো শিশুকে দুধ খাওয়ানো অবস্থায় গাঙগরের ছবি তুললেন? সংবাদপত্রে কেনোই-বা এমন স্পর্শকাতর ছবি প্রকাশ হলো, তাও আবার ধর্ষণবিষয়ক সংবাদের সঙ্গে! তাহলে এই ছবির সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ক কী? এর ফলে গাঙগরের জীবনে যে-প্রভাব পড়তে পারে, তা ফটোসাংবাদিক-সম্পাদক-প্রকাশক কি একবারও ভাবার প্রয়োজন বোধ করেননি? উপরের এ-প্রশ্নগুলোর জবাব কোনো তাত্ত্বিক জায়গা থেকে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে নিজের সঙ্গে নিজের যতোটুকু বোঝাপড়া, সেই জায়গা থেকে একটু দেখার চেষ্টামাত্র।

সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ ও গণমাধ্যমের মিথোজীবীতামূলক সম্পর্ক সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল স্থিতাবস্থা ক্ষুণœ হোক তা কখনই চায়নি। কারণ বিপ্লব, জনগণের মনোজগতের ইতিবাচক পরিবর্তন, হীনমন্য সংস্কৃতি-দর্শন থেকে  প্রগতিশীলতা অর্জন, মুনাফার পথে বড়ো বাধা; এতে পুঁজি-গণমাধ্যম-এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। একইভাবে, নারী-পুরুষের প্রতি সমাজে যে-বৃত্তাবদ্ধ ধারণা চালু আছে, গণমাধ্যমও তা জারি রাখতে চায়। সহজ করে বললে-গণমাধ্যম পুরুষতান্ত্রিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। পুরুষ প্রাধান্যশীল সমাজে পুরুষ নারীকে যেভাবে দেখে, গণমাধ্যমও তাকে ঠিক ওভাবেই দেখায়। তাই ধর্ষণ বিষয়ক সংবাদের সঙ্গে গাঙগরের স্পর্শকাতর ছবি জুড়ে দেওয়া তাদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। উল্টো সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষ-পাঠক বা দর্শকের জন্য তা একটু-টক-একটু-মিষ্টি-চাটনি হয়ে ওঠে। ফলে পাঠক ধর্ষণ ঘটনায় আহত না হয়ে, বিনোদিত হয়। নারীর এমন অসহায়ত্বের প্রতি পুরুষ হয়ে পড়ে অনুভূতিশূন্য। আর পুরুষের চোখের এমন অসহায়-অনুভূতিশূন্য মূল্যবোধে নির্মিত বস্তু-নারী/পণ্য-নারীকে নিয়ে গণমাধ্যমে চলতে থাকে প্রতিদিন-প্রতিক্ষণ ব্যবসা। তাই গাঙগরের স্পর্শকাতর অবস্থায় উপিনের তোলা ছবির কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। গাঙগরদের অসহায়ত্বের সুযোগে টাকার বিনিময়ে হলেও ছবি তুলতে পিছপা হয় না উপিনরা। একইভাবে এই ছবি গাঙগরের জীবনে কী বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভাববার কোনো প্রয়োজন পড়ে না সম্পাদক-প্রকাশকের। এরা কেবল জানে গাঙগরদের শরীর পুঁজি করে কীভাবে ব্যবসা করা যায়।

নজর দিই, আমাদের দেশের গণমাধ্যমের দিকে। ধর্ষণ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এ-দেশের গণমাধ্যম ও তাদের দর্শকদের তেমন কোনো ভিন্নতা লক্ষ করা যায়নি। কিশোরী ধর্ষণ, তরুণী ধর্ষণ, যুবতী ধর্ষণ, রাতভর ধর্ষণপালাক্রমে ধর্ষণ, উপর্যুপরি ধর্ষণ, গণধর্ষণ, নির্জনস্থানে ধর্ষণ, বাঁশঝাড়ে ধর্ষণ, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে ধর্ষণ, রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধারÑএমন নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করে প্রিন্ট-মিডিয়া ধর্ষণ সংবাদ এমনভাবে উপস্থাপন করে, যা পুরুষ-পাঠককে ছদ্ম-সঙ্গমের খোরাক যোগায়। আমার দেখা অনেক পরিচিত আছেন, যারা পুরো পত্রিকাজুড়ে সুনিবিড়ভাবে ধর্ষণের সংবাদ খুঁজে বেড়ান। ধর্ষণ সংবাদ পেলেই তাদের মুখাবয়ব চকচক করে ওঠে।

যৌক্তিক প্রশ্ন হলো, এরা কেনো ধর্ষণ সংবাদ খোঁজে; তা পড়ে ব্যথিত না হয়ে কেনো বিকৃত আনন্দ উপভোগ করে? পাঠক, আপনি যদি এ-সংবাদগুলো পড়েন নিশ্চয়ই খেয়াল করবেন, সেখানকার উদ্দেশ্যমূলক নির্দিষ্ট কিছু শব্দের ব্যবহার। ধর্ষণ মানেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক। কিন্তু প্রতিবেদনে যখন জোরপূর্বক শব্দটি ব্যবহার হয়, তখন দ্যোতক-দ্যোতিতের মিলনে পাঠক কল্পনায় ধস্তাধস্তি দেখে। রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণ-এর ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটে। এভাবে গণমাধ্যম নারীর দুর্বলতা ও ধর্ষকের আগ্রাসনকে পাশাপাশি তুলে এনে আরেক দফা ক্ষতিগ্রস্ত নারীর শ্লীলতাহানি ঘটায়। ক্ষতিগ্রস্ত নারীর জীবনে যে-অন্তহীন বিষবাষ্প নেমে আসে, সংবাদপত্র তা পাঠককে বুঝতে দেয় না। পাঠকের ছায়া প্রতিনিধি ধর্ষক থেকে যায় আলোচনার আড়ালে। যা পুরুষ মননে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি জিইয়ে রাখার পাশাপাশি, নারীর মননেও পুরুষতান্ত্রিকতাকে শান দেয়।

বর্তমান বিশ্বে এককেন্দ্রিক মুনাফামুখিনতায় বেড়ে গেছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। কোনো আর্মি-পুলিশি রাষ্ট্রের পক্ষে এই বৈষম্যমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা টিকে রাখা দুষ্কর। তাই নারী-পুরুষ উভয়ের মনোজগত থেকে দৈনন্দিন সমস্যা ভুলিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় গণমাধ্যম। কারণ, পুঁজিপতিরা জানে নারীর স্বনির্ভরতা পুঁজিবাদী-পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলবে। তাই গণমাধ্যম চায় না, ইলা মিত্র, প্রীতিলতার মতো নারীরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুক; বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের মতো নারী মুক্তির অগ্রদূত তৈরি হোক; মাদার তেরেসা হয়ে সমাজের দুঃখ-জঞ্জাল দূর করুক। উল্টো তাদের স্বনির্ভরতা বন্দি করা হয় নকশা পাতায়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায়।

 

শেষ দিয়ে শুরু

প্রস্তাবনায় অনেককিছুর সঙ্গে গণমাধ্যমকে বেশ্যা হিসেবে অ্যাখ্যা করেছিলাম, এতোক্ষণ তা দেখানোর চেষ্টা করেছি মাত্র। এভাবেই সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত গণমাধ্যম। আর গণমাধ্যমের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দালালরূপে নিয়োগ থাকে উপিনরা। তাই এরা আর গণমানুষের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না। যেমন তারা বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি সুদানের সেই শিশুটির কিংবা পুরুলিয়ায় অসহায় গাঙগরের; একইভাবে পুরান ঢাকার নিরীহ বিশ্বজিতের। দুর্বৃত্তরা চাপাতি-রড-লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে যখন মারছিলো-কোপাচ্ছিলো বিশ্বজিৎকে, তখন ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করে সিনেমাটিক ভাষায় তা কতো নিখুঁতভাবে তুলে ধরা যায়, তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলো আমাদের উপিনরা। কে, কীভাবে, কতো তাড়াতাড়ি ব্রেকিং নিউজ দিতে পারে, তা নিয়েও প্রতিযোগিতার অন্ত ছিলো না। অথচ প্রতিযোগিতা হয়নি, বিশ্বজিৎ-এর রক্তাক্ত দেহটি সাংবাদিকের স্টিকার লাগানো গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। নামত সমাজ পরিবর্তনকারীরা যখন এসব নিয়ে ব্যস্ত, তখন ওই বিশ্বজিতের জায়গা হয়েছিলো অশিক্ষিত, অসভ্য, ছোটজাতের রিকশাচালকের রিকশায়। যে-জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিশ্বজিতের রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ছুটে গিয়েছিলো হাসপাতালে; জীবন গিয়েছিলো, জীবন বাঁচাতে; এক ঈশ্বর দাঁড়িয়েছিলো, আরেক ঈশ্বরের পাশে!

একজন গাঙগর, একজন ইয়াসমিন কিংবা একজন বিশ্বজিৎ কেউই তাদের নিজ যোগ্যতায় সংবাদ হয়ে ওঠে না। আর সংবাদ হলেও এক বিশ্বজিৎ যায়, আরেক বিশ্বজিৎ আসে। এ-জন্যই হয়তো কেভিন কার্টাররা ক্ষুধার্ত ওই শিশুটিকে বাঁচাতে এগিয়ে না এসে, শতভাগ পেশাদারিত্বের পরিচয় দেন। আর এজন্য জিতে নেন বিশ্বসেরা পুরস্কার; নায়ক হয়ে ওঠেন গণমানুষের! এখন প্রশ্ন, আসলেই কি এই নায়করা গণমানুষের?

 

লেখক : মাহমুদুল হাসান পারভেজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি মঞ্চনাটকে কাজ করেন।

mhparvez52@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

১. জনতাকে নিংড়ে টাটা-আম্বানিদের সম্পদবৃদ্ধি : এর নাম কি দেশের ধনী হওয়া; গণদাবী,  সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অফ ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট)Ñএর বাংলা মুখপত্র (সাপ্তাহিক); সম্পাদনা-রণজিৎ ধর; বর্ষ-৬৫, সংখ্যা-৮, ২১-২৭ সেপ্টেম্বর-২০১২, পৃষ্ঠা-৬।

২. প্রাগুক্ত; গণদাবী।

৩. অনাহারী মানুষ না কোটিপতিÑপ্রধানমন্ত্রী কোন ভারতের; গণদাবী,  সোস্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অফ ইন্ডিয়া (কমিউনিস্ট)Ñএর বাংলা মুখপত্র (সাপ্তাহিক); সম্পাদনা-রণজিৎ ধর; বর্ষ-৬৪, সংখ্যা-৪৪, ৬-১২ জুলাই-২০১২, পৃষ্ঠা-৩।

৪. http://www.odhikar.org/documents/2012/English/Jan_Sep_2012_HRR_English.pdf

৫. ২০১১ সালে ২৬ জুন রংপুরে এক গ্রাম্য সালিশে দুজন নারীকে পিটিয়ে জখম করা হয়। এ-ঘটনায় ৭ জুলাই হাইকোর্টের দুইজন বিচারপতি গ্রাম্য মাতবরদের গ্রেফতারে নির্দেশ দেন। পরে ডিসেম্বর মাসে আদালত এই দুই নারীকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য রংপুরের পুলিশ সুপারকে নির্দেশও দেন। কর্তব্যরত এক পুলিশ তাদের মধ্যে একজনকে জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করে।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন